বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৬ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৭ রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

চট্টগ্রামে ট্যাংক দুর্ঘটনা: সৈনিক পিয়াসের শেষ বিদায়ে কাঁদল মালিপাড়া

মুক্তবাণী রিপোর্ট : চোখের সামনে ভাসছে ছোট্ট ফাতেমা আক্তারের মুখ। বয়স মাত্র ১৮ মাস।
বাবার শেষ বিদায়ে যখন স্বজন, এলাকাবাসীর চোখে পানি, তখন কিছুই বুঝতে পারেনি পিয়াসের ১৮ মাসের মেয়েটি। বাবার চলে যাওয়ার অর্থ বোঝার বয়স হয়নি তার।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে একদিন সে বুঝবে দেশের জন্য দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তার বাবা আর কোনোদিন ফিরে আসেননি। দেশের সেবায় নিয়োজিত তরুণ সৈনিক আবু বকর সিদ্দিক পিয়াসের জীবন থেমে গেল এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায়।

বুধবার চট্টগ্রামের হাটহাজারী ফিল্ড ফায়ারিং অনুশীলনে ট্যাংক থেকে গোলাবর্ষণের সময় আকস্মিক দুর্ঘটনায় নিহত হন সৈনিক পিয়াস। এসময় আরও এক সেনা সদস্য নিহত ও গুরুতর আহত হন আরেক সেনা কর্মকর্তা।
আকস্মিক এ মৃত্যুতে পিয়াসের পরিবারে নেমে এসেছে শোকের মাতম। স্বজন প্রতিবেশীদের চোখেও এখন কেবলই অশ্রু।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার মালিপাড়া গ্রামে জানাজা শেষে সামরিক মর্যাদায় গার্ড অব অনার দিয়ে তাকে দাফন করা হয়।

নিহত আবু বকর সিদ্দিক পিয়াস নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার সুন্দলপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মালিপাড়া গ্রামের আব্দুল ওয়াহাবের ছেলে। চার বোনের একমাত্র ছোট ভাই ছিলেন তিনি। শান্ত, ভদ্র ও অমায়িক স্বভাবের কারণে ছোটবেলা থেকেই এলাকায় সবার প্রিয় ছিলেন পিয়াস।

পরিবারের সদস্যরা জানান, চাকরির সুবাদে স্ত্রী-সন্তান, বাবা-মাকে নিয়ে চট্টগ্রামের সেনা কোয়ার্টারে বসবাস করতেন পিয়াস। দেশের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পরিবারকে ঘিরেও ছিল তার ছোট্ট স্বপ্নের সংসার। ১৮ মাস আগে সেই সংসারেই আসে কন্যা সন্তান। মেয়েকে ঘিরে পরিবারের আনন্দের মধ্যেই হঠাৎ নেমে এলো শোকের কালো ছায়া।

নিহতের চাচা মোশারেফ হোসেন বলেন, ১৮ মাস আগেই পিয়াসের ঘর আলো করে একটি কন্যা সন্তান এসেছিল। মেয়েকে ঘিরে যখন পরিবারের আনন্দ-উচ্ছ্বাস, ঠিক তখনই এলো তার মৃত্যুর খবর। বাবার স্নেহ-ভালোবাসা বোঝার আগেই বাবাকে হারাল সেই শিশু।

নিহতের ভগ্নিপতি আবু সাঈদ জানান, পিয়াস ছিলেন পরিবারের চার বোনের একমাত্র ছোট ভাই। ছোটবেলা থেকেই শান্ত ও সহজ-সরল স্বভাবের ছিলেন তিনি। সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন। তার ব্যবহার ছিল অত্যন্ত অমায়িক। এ কারণে স্বজন ও প্রতিবেশীদের কাছেও তিনি ছিলেন খুবই প্রিয়।

পিয়াসের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মালিপাড়া গ্রামজুড়ে নেমে আসে শোকের আবহ। বৃহস্পতিবার সকালে শেষবারের মতো প্রিয় মানুষটিকে দেখতে ছুটে আসেন স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয়রা। পরিবারের সদস্যদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।

স্থানীয় বাসিন্দা এবাদ উল্যাহ বলেন, পিয়াস খুব ভালো মানুষ ছিলেন। তার এমন অকাল মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। সবচেয়ে কষ্টের বিষয়, মাত্র ১৮ মাসের একটি মেয়েকে রেখে তাকে চলে যেতে হলো।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, হাটহাজারী ফিল্ড ফায়ারিং অনুশীলনের সময় ট্যাংক থেকে গোলাবর্ষণের একপর্যায়ে আকস্মিক দুর্ঘটনা ঘটে। এতে দুই সেনা সদস্য নিহত হন এবং এক সেনা কর্মকর্তা গুরুতর আহত হন। আহত কর্মকর্তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য হেলিকপ্টারে করে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

কবিরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পূদম পুষ্প চাকমা জানান, সামরিক মর্যাদায় গার্ড অব অনার দিয়ে তাকে দাফন করা হয়। দেশের সেবায় নিয়োজিত একজন তরুণের এভাবে চলে যাওয়া অত্যন্ত বেদনাদায়ক। বিকেলে আমরা তার গ্রামের বাড়িতে যাব। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের পরিবারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা থাকবে। সৈনিক আবু বকর সিদ্দিক পিয়াসের আকস্মিক মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত।