সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৩০ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২ রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

লাউয়াছড়ার মহাবিপন্ন বন্যপ্রাণী ‘লজ্জাবতী বানর’

নিজস্ব প্রতিবেদক : দিনের আলোতে বন্যপ্রাণীটির দেখা পাওয়া কঠিন। কারণ, ওদের চলাফেরা, খাবার সংগ্রহ এবং একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ সব কিছুই রাতের বেলায়।
ফলে এই বন্যপ্রাণীটিকে দিনে কখনোই দেখা যায় না। তাই সাধারণ মানুষেরা এই বিশেষ প্রজাতির প্রাণী সম্পর্কে তেমন কিছুই জানেন না।

জীববৈচিত্র্যের অন্যতম সমৃদ্ধ এলাকা মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। এ উদ্যানের অন্যতম বন্যপ্রাণী ‘লজ্জাবতী বানর’।
এদেরকে ইংরেজিতে ‘বেঙ্গল স্লো লরিস’ বলা হয়। এরা নিশাচর।

আইইউসিএন, বাংলাদেশ এর লালতালিকা (রেডলিস্ট) অনুযায়ী এই প্রাণীটি ‘মহাবিপন্ন’ (ইএন)।

সাম্প্রতিক সময়ে নানান বন্যপ্রাণী উদ্ধার এবং তাদের হঠাৎ করে লাউয়াছড়ায় অবমুক্তকরণের অনেকটাই ঝুঁকি দেখা দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গবেষকদের দাবি- সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রটোকল না মেনে উদ্ধার করা লজ্জাবতী বানর যত্রতত্র অবমুক্ত করায় আশঙ্কাজনক হারে প্রাণীটি মারা যাচ্ছে।

গবেষকদের মতে, উপযুক্ত বাসস্থান ও খাদ্যের নিশ্চয়তা ছাড়া হঠাৎ বনে ছেড়ে দেওয়ায় আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব ও আবাসস্থল সংকটে পড়ছে অবমুক্ত করা বানর। এতে তাদের টিকে থাকার হারও কমে যাচ্ছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত লাউয়াছড়ায় রেডিও কলার পরিয়ে অবমুক্ত করা নয়টি লজ্জাবতী বানরের মধ্যে সাতটিই অল্প সময়ের মধ্যে মারা যায়। মূলত উপযুক্ত আবাসস্থলের অভাব এবং এলাকা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বনে থাকা অন্য বানরের সঙ্গে প্রাণঘাতী সংঘর্ষে তাদের মৃত্যু হয়েছে।

এদিকে বন উজাড়ের কারণে খাদ্যের সংকট তৈরি হওয়ায় অনেক লজ্জাবতী বানর লোকালয়ে চলে আসছে। এ সময় সড়ক ও রেলপথে কাটা পড়ে এবং বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যাচ্ছে অনেক প্রাণী।

বন্যপ্রাণী গবেষক হাসান আল রাজীর সমন্বয়ে দেশি-বিদেশি গবেষকদের একটি অভিজ্ঞ টিমের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী বর্তমানে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে প্রায় ২৩টি লজ্জাবতী বানর টিকে রয়েছে।

গবেষকদের মতে, ধীরগতির চলাফেরা ও মায়াবী বড় গোল চোখের এই প্রাণী ভয় পেলে মুখ ঢেকে ফেলে। এ কারণেই এর নামকরণ হয়েছে ‘লজ্জাবতী বানর’। প্রাণীটি বন্য এবং কিছুটা বিষাক্ত। তাই কোনোভাবেই এটি পোষা প্রাণী হিসেবে ঘরে রাখার উপযোগী নয়। লাউয়াছড়ার পুরোনো গাছ কাটা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংসের কারণে তাদের খাদ্যের উৎসও দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে।

‘বৈজ্ঞানিক প্রটোকল কঠোরভাবে মেনে না চললে বন্যপ্রাণী অবমুক্তকরণ কোনো ইতিবাচক ফল আনবে না’ বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ফিরোজ জামান।

তবে লজ্জাবতী বানর সংরক্ষণে কিছু উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। ২০২২ সাল থেকে জার্মানভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘প্লামপ্লরিস ইভি’ ও স্থানীয় বন বিভাগের যৌথ উদ্যোগে বিভিন্ন স্থান থেকে ২৩টি লজ্জাবতী বানর উদ্ধার করে সেবা-শুশ্রূষা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৫টিকে ইতোমধ্যে বনে অবমুক্ত করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, লাউয়াছড়া, সাতছড়ি ও রেমা-কালেঙ্গার নিবিড় চিরহরিৎ বনে বিচরণ করা এই বিরল নিশাচর প্রাণীটিকে টিকিয়ে রাখতে হলে বন ধ্বংস রোধ, শিকার বন্ধের পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক ও সঠিক অবমুক্তকরণ নীতিমালা কার্যকর করার বিকল্প নেই।

বন্যপ্রাণী গবেষক ও আইইউসিএন স্তন্যপায়ী দলের সদস্য তানভীর আহমেদ জানান, বিশ্বে প্রাইমেট বর্গের ৭৯ গোত্রের ৫০৪ প্রজাতির বানর রয়েছে। তবে ১০ প্রজাতির বানর ও হনুমান রয়েছে। এর ৬ প্রজাতি ‘বিপদগ্রস্ত’ তালিকার। আর লরিসিডি পরিবারের লজ্জাবতী বানর ‘মহাসংকটাপন্ন’। এটি নিশাচর ও লাজুক স্বভাবের। দৈর্ঘ্যে ২৬ থেকে ৩৮ সেন্টিমিটার এবং ওজন ১ থেকে ২ কেজি। মাথা গোলাকার, মুখ চ্যাপ্টা, মায়াবী চোখ বেশ বড়। তবে কান ও লেজ ছোট। শরীর ঘন ময়লাটে সাদা-বাদামি লোমে ঢাকা। মাথার ওপর থেকে গাঢ় রঙের দাগ পিঠ বেয়ে নিচে গেছে।

বিচরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, লজ্জাবতী বানর একাকী ও নীরবে থাকতে পছন্দ করে। সারাদিন গাছের উঁচু কোটরে অথবা পাতাভরা ঘন ডালের আঁধারে ঘুমিয়ে কাটায়। সন্ধ্যার পর একা বা জোড়ায় খাবারের সন্ধানে নামে। বাঁচে বড়জোর ২০ বছর। বছরে একবার একটি বাচ্চা প্রসব করে। চিরসবুজ ও বৃষ্টিপাতপূর্ণ ঘন বন বা বাঁশঝাড় এদের খুব পছন্দ। শ্রীমঙ্গলের বনাঞ্চলে এদের দেখা মেলে। পোকামাকড়, ছোট ফলমূল, গাছের নরম বাকল এবং জিগার আঠালো খাবার খুব পছন্দের। পরাগায়ণে ভূমিকা রয়েছে।

বিগত দুই দশকে এদের সংখ্যা অর্ধেকে নেমেছে। দেখতে সুন্দর বলে আন্তর্জাতিক চোরাবাজারে এর চাহিদা বেশি। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মিয়ানমার, চীন, কম্বোডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে এদের দেখা মেলে বলে জানান তিনি।