সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৩০ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২ রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

বাঁচার আকুতি খাগড়াছড়ির গৃহকর্মী শিশু তানিয়ার

এইচ এম প্রফুল্ল, খাগড়াছড়ি : মেয়ে ভালো থাকবে, বিয়ে হবে প্রতিবেশীর পরামর্শে মেয়ে তানিয়াকে ঢাকায় পাঠিয়ে ছিলেন বাবা বেলাল হোসেন। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস বেলালের মেয়ে ঢাকায় গৃহকত্রীর নির্যাতনের শিকার হয়ে এখন খাগড়াছড়ি হাসপাতালে মৃত্যুর প্রহর গুনছে। বাঁচার আকুতি করছে বার বার।

খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার আমতলী ইউনিয়নের দিনমজুর বেলালের হোসেনের ঘরে ছিল দুই মেয়ে। তার অভাবের সংসারে ১১ বছর আগে জন্ম নিয়েছিল প্রথম সন্তান তানিয়া। জন্মের পাঁচ বছর আগে মারা যান তানিয়ার মা । তানিয়া স্থানীয় একটি মাদরাসায় চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ছিল। কিন্তু যে সময় তানিয়া কাঁধে ব্যাগ নিয়ে মা-বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল সে সময় তানিয়াকে পাঠানো হয় গৃহকর্মীর কাজে। সে তানিয়া আজ ক্ষত-বিক্ষত শরীর নিয়ে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালের মেঝেতে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করছে। ছটফট করছে মৃত্যু যন্ত্রনায়।

জানা গেছে, দেড় বছর আগে প্রতিবেশী তোফাজ্জল হোসেনের পরামর্শে মেয়ে তানিয়াকে গৃহকর্মীর কাজে ঢাকায় পাঠাতে রাজি হন বাবা বেলাল হোসেন। প্রলোভন ছিল তানিয়া সেখানে ভালো থাকবে ও সময় হলে তার বিয়েও দেওয়া হবে। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস। এখানে তানিয়ার কপালে দু’মুঠো খাবার কিংবা নিরাপদ আশ্রয় জোটেনি। বরং দিনের পর দিন তার উপর চালানো হয়েছে অমানুষিক নির্যাতন, রাখা হয়েছে টয়লেটে বন্দী করে। গরম খুন্তির তাপে ঝলসানো শরীর আর পঁচন ধরা পা নিয়ে সেই তানিয়া এখন মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার প্রহর গুনছে খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালের মেঝেতে।
তানিয়ার ছোট্ট এই দেহটির এমন কোনো অংশ নেই যেখানে খুন্তির পোড়া দাগ নেই। এমনভাবে তার ওপর পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়েছে যা দেখলে যে কেউই আঁতকে উঠবেন। মাথায় একাধিক সেলাই, শরীরজুড়ে নির্যাতনের ক্ষত। পিঠে বড় ফুটো হয়ে পঁচন ধরেছে। পঁচন ধরেছে দুই পায়ে। হাড্ডিসার দেহ আর চোখেমুখে ক্লান্তি নিয়ে পুষ্টিহীনতায় তানিয়া এখন পড়ে আছে খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালের মেঝেতে। তবে মৃত্যুর মুখোমুখি দাড়িয়েও তার উপর নির্মম নির্যাতনের বিচার চান তানিয়া।
দিনমজুর বেলাল হোসেন জানান, মা হারা মেয়েকে ভালো ভবিষ্যতের আশায় প্রতিবেশি তােফাজ্জল হোসেনের মাধ্যমে তানিয়াকে পাঠানো হয়। যার কাছে পাঠানো হচ্ছে তার ঠিকানাটিও জানতেন না অসহায় তোফাজ্জল। প্রতিবেশী তোফাজ্জলের মাধ্যমে প্রথমে ফেনী শহরের ট্রাংক রোড বড় মসজিদ-সংলগ্ন একটি বাসায় তানিয়াকে দিয়ে আসেন বেলাল। পরে তাকে পাঠানো হয় ঢাকায়। তানিয়া ঠিকানা বলতে না পারলেও জানিয়েছে, তাকে মিরপুরের একটি বাড়িতে রাখা হয়। ওই বাড়ির গৃহকর্তার নাম রাসেল, গৃহকর্ত্রীর নাম ছোটন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, গৃহকত্রীর নাম মোর্শেদা আক্তার শেওড়াপাড়া ঢাকা(এনআইডি) মতে।
প্রতিবেশী তোফাজ্জল হোসেন বলেন, তার কথায় বেলাল হোসেন মেয়েকে দেড় বছর আগে গৃহকর্মীর কাজে ঢাকায় পাঠাতে রাজি হন।
খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. রিপল বাপ্পী চাকমা বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে। বর্তমানে শারীরিক অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক। বাঁচাতে হলে প্রয়োজন উন্নত ও জরুরি চিকিৎসা।
তানিয়ার এই ক্ষত-পোঁড়া শরীরটি আমাদের বিবেকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি কঠিন প্রশ্ন। এটি আমাদের মানবিক অবক্ষয়ের ঘৃণ্য দৃষ্টান্ত। আর তাই এমন নির্মমতার শাস্তিটাও যেনো দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে এমনটাই দাবি সাধারণ মানুষের।তবে আমাদের সামাজিকতা ও মানবিকতার অবক্ষয়ের যে অসুখ হয়েছে সেই চিকিৎসার দায়িত্ব নেবে কে?