দেশে গ্যাসের সংকট ও নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় এলপিজি সিলিন্ডার এখন কোটি মানুষের রান্নার অন্যতম প্রধান ভরসা। শহর থেকে গ্রাম- বাড়ছে সিলিন্ডারের ব্যবহার, বাড়ছে বাজার ও সরবরাহব্যবস্থা। কিন্তু ব্যবহারের এই বিস্তারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়েনি নিরাপত্তা ও তদারকির ব্যবস্থা। ফলে প্রয়োজনীয় জ্বালানি ধীরে ধীরে বহু পরিবারের জন্য ঝুঁকির উৎস হয়ে উঠছে। একটি পুরনো পাইপ, ত্রুটিপূর্ণ রেগুলেটর, ঢিলা ভালভ কিংবা অনিরাপদ সংযোগ থেকেই যে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড বা বিস্ফোরণ ঘটতে পারে, সাম্প্রতিক একাধিক ঘটনা তারই প্রমাণ।
সর্বশেষ আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় সিলিন্ডারবাহী কাভার্ডভ্যানে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা নতুন করে সামনে এনেছে। আগুন ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের আরও কয়েকটি সিলিন্ডারবাহী গাড়িতে। একের পর এক সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে ছিটকে পড়ে আশপাশের আবাসিক এলাকা ও বিভিন্ন ভবনের ছাদে। কয়েকটি সিলিন্ডার টিনের চালা ভেদ করে ঘরের ভেতরেও ঢুকে যায়। এতে ৯ জন নিহত এবং ২৬ জন আহত হন। এমন ঘটনা শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অগ্নিনিরাপত্তা, পণ্য পরিবহন, গুদাম ব্যবস্থাপনা এবং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার বড় ধরনের প্রশ্ন।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য আরও উদ্বেগজনক। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন বছরে গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে দেশে ১ হাজার ৯৯৯টি অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় হতাহত হয়েছেন তিন শতাধিক মানুষ। শুধু ২০২৫ সালে গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ ও বিস্ফোরণ থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ৪১টি। এর আগের বছর ছিল ৭৪৮টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পরিস্থিতির অবনতি স্পষ্ট। চলতি বছরের প্রথম আট মাসেও সিলিন্ডার লিকেজ থেকে প্রায় সাড়ে ৭০০ অগ্নিদুর্ঘটনার তথ্য এসেছে। এই পরিসংখ্যানকে আর বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
দুর্ঘটনার বড় একটি অংশের সূত্রপাত হয় গ্যাস লিকেজ থেকে। রান্নাঘর বা ঘরের ভেতর পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল না থাকলে লিক হওয়া গ্যাস জমে যেতে পারে। এরপর বৈদ্যুতিক সুইচের সামান্য স্পার্ক, দিয়াশলাই, লাইটার কিংবা চুলার আগুনই ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে নিম্নমানের রেগুলেটর, পুরনো বা ক্ষতিগ্রস্ত পাইপ এবং ভুলভাবে সংযোগ স্থাপনও ঝুঁকি বাড়ায়। অর্থাৎ সিলিন্ডার নিজে যতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তার চেয়ে বড় বিপদ তৈরি হতে পারে সিলিন্ডারের আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম ও ব্যবহারের অনিয়ম থেকে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও ভয়ংকর একটি প্রবণতা- মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডারের ব্যবহার ও পুনর্বাজারজাতকরণ। বিস্ফোরক পরিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২০ বছরের পুরনো সিলিন্ডার ধ্বংস করার নিয়ম থাকলেও কিছু চক্র সেগুলো সংগ্রহ করে পুনরায় গ্যাস ভরে বাজারজাত করছে। আবার মেয়াদ থাকা সিলিন্ডারও নির্দিষ্ট সময় পরপর পরীক্ষা করার কথা থাকলেও তা যথাযথভাবে হচ্ছে না। এই অনিয়ম মানুষের জীবনকে সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
এখানে তদারকির দুর্বলতাই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়। সারাদেশে সিলিন্ডার সরবরাহ ও মজুদ তদারকির জন্য পরিদর্শক পর্যায়ে কর্মকর্তা মাত্র ১২ জন। এর মধ্যে ঢাকায় রয়েছেন ছয়জন। অভিযান পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত যানবাহন নেই, আবার ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা না থাকায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এত বিশাল একটি বাজারকে এত অল্প জনবল দিয়ে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যে কঠিন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
অতএব শুধু দুর্ঘটনার পর তদন্ত বা ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা নয়, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করতেই হবে। বিস্ফোরক পরিদপ্তরের জনবল ও লজিস্টিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আইনগত ক্ষমতা নিশ্চিত করা জরুরি। সিলিন্ডার উৎপাদন থেকে শুরু করে রিফিলিং, পরিবহন, গুদামজাতকরণ ও বিক্রয়- প্রতিটি পর্যায়ে নিয়মিত পরিদর্শন ও জবাবদিহি থাকতে হবে। মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার ধ্বংসের ব্যবস্থা কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে এবং নির্ধারিত সময় পরপর সিলিন্ডার পরীক্ষার বিষয়টি বাধ্যতামূলকভাবে নিশ্চিত করতে হবে। অননুমোদিত রিফিলিং ও নিম্নমানের রেগুলেটর-পাইপের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান প্রয়োজন। পাশাপাশি ভোক্তাদেরও সিলিন্ডারের মেয়াদ, রেগুলেটর, পাইপ ও সংযোগ নিয়মিত পরীক্ষা করার বিষয়ে সচেতন করতে হবে। গ্যাসের গন্ধ পেলে বৈদ্যুতিক সুইচ না জ্বালিয়ে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়া এবং প্রয়োজনে ফায়ার সার্ভিসের সহায়তা নেওয়ার বিষয়েও ব্যাপক প্রচার দরকার।
এলপিজি এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। তাই এর নিরাপত্তাকে কোনোভাবেই ব্যক্তিগত সতর্কতার ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। রাষ্ট্র, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা- তিন পক্ষের দায়িত্বশীলতাই পারে ঝুঁকি কমাতে। দুর্ঘটনার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে দুর্ঘটনার আগেই অনিয়ম বন্ধ করা জরুরি। প্রয়োজনীয় জ্বালানি মানুষের জীবনকে সহজ করবে- মৃত্যুফাঁদে পরিণত হবে না- এটাই নিশ্চিত করা এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রধান দায়িত্ব।