অলিগলি থেকে প্রধান সড়ক- ঢাকার প্রায় সর্বত্রই এখন ব্যাটারিচালিত ই-রিকশার উপস্থিতি। স্বল্প দূরত্বে কম খরচে যাতায়াতের সুবিধা এবং বিপুল কর্মসংস্থানের কারণে বাহনটি নগরবাসীর কাছে জনপ্রিয় হয়েছে। কিন্তু পরিকল্পনাহীন বিস্তার, অনিয়ন্ত্রিত চলাচল, অদক্ষ চালক এবং অনুমোদনহীন চার্জিংয়ের কারণে এই জনপ্রিয় বাহনই এখন নগরবাসীর জন্য তৈরি করছে নানা ঝুঁকি। ফলে ই-রিকশা একেবারে বন্ধ করা কিংবা নির্বিচারে চলতে দেওয়া- দুটির কোনোটিই বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট নীতিমালা, নিবন্ধন ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, রাজধানীতে ই-রিকশার প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে সরকারি সংস্থাগুলোর কাছেই নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। দুই সিটি করপোরেশনে নিবন্ধিত প্যাডেলচালিত রিকশা প্রায় ২ লাখ ১৩ হাজার। অথচ ২০১৯ সালের এক গবেষণায় ঢাকায় রিকশার সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ বলে উঠে এসেছিল। এর মধ্যে প্রতিদিন নতুন করে যুক্ত হচ্ছে ই-রিকশা। বিভিন্ন সংগঠনের নামে নম্বর প্লেট দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ফলে বৈধ কর্তৃপক্ষের বাইরে এক ধরনের সমান্তরাল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কোনো যানবাহনের সংখ্যা, মালিকানা ও চলাচলের তথ্যই যদি সরকারের কাছে না থাকে, তাহলে সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করা যে কঠিন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
ই-রিকশার ঝুঁকির আরেকটি দিক সড়ক নিরাপত্তা। নির্দিষ্ট নকশা ছাড়া স্থানীয়ভাবে তৈরি এসব যানের কাঠামোগত মান এক নয়। অনেক চালকের প্রশিক্ষণ বা দক্ষতা যাচাইয়ের ব্যবস্থাও নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রধান সড়কে বাস, ট্রাক ও অন্যান্য দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে একই পথে চলাচল। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামানের বক্তব্যও এখানে গুরুত্বপূর্ণ- দুর্বল কাঠামোর যান এবং দুর্বল চালক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। তাই দ্রুত বিধিমালা অনুমোদন ও বাস্তবায়নের প্রয়োজন রয়েছে।
বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনাও উপেক্ষা করার মতো বিষয় নয়। সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে বৈদ্যুতিক তিন চাকার যান ৫০ থেকে ৮০ লাখের মতো এবং এগুলো মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহার করছে। শুধু ঢাকাতেই প্রায় ৪৮ হাজার অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট থাকার বিপরীতে বৈধ চার্জিং স্টেশন প্রায় ৩ হাজার ৩০০। বাসাবাড়ি কিংবা চোরাই সংযোগে চার্জ দেওয়ার প্রবণতা বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় যেমন চাপ সৃষ্টি করছে, তেমনি তৈরি করছে অগ্নিঝুঁকি ও বিদ্যুৎ অপচয়ের আশঙ্কা।
পরিবেশগত ঝুঁকিও কম নয়। অধিকাংশ ই-রিকশায় ব্যবহৃত লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি নির্দিষ্ট সময় পর পরিবর্তন করতে হয়। পুরনো ব্যাটারি অনিয়ন্ত্রিতভাবে ভাঙা বা পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা হলে সিসাসহ ক্ষতিকর উপাদান মাটি, পানি ও বায়ুতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কাজেই ই-রিকশার নীতিমালায় শুধু যানটির অনুমোদন নয়, ব্যাটারি ব্যবস্থাপনাকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তবে বাস্তবতা হলো, লাখ লাখ মানুষের যাতায়াতের প্রয়োজন এবং বিপুলসংখ্যক চালক-মালিকের জীবিকার সঙ্গে ই-রিকশা জড়িয়ে গেছে। তাই অভিযান চালিয়ে এক এলাকা থেকে সরিয়ে অন্য এলাকায় ঠেলে দেওয়া কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সহসভাপতি-১ পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসানের প্রস্তাব অনুযায়ী, নির্দিষ্ট নকশার ই-রিকশা নিবন্ধনের আওতায় এনে প্রধান সড়কে চলাচল বন্ধ করার পাশাপাশি কোন সড়কে কী ধরনের যান চলবে, তার সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন। একইভাবে আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খানও এলাকাভিত্তিক কোটা, লাইসেন্স এবং মান নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
এখন সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত ঢাকায় ই-রিকশার পূর্ণাঙ্গ জরিপ ও ডিজিটাল নিবন্ধন। নির্দিষ্ট নকশা ও নিরাপত্তামান ছাড়া কোনো নতুন ই-রিকশা রাস্তায় নামানো যাবে না। চালকদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা যাচাই করে লাইসেন্স দিতে হবে। প্রধান সড়ক, আঞ্চলিক সড়ক ও অলিগলির জন্য পৃথক রুট ও গতিসীমা নির্ধারণ করতে হবে। অবৈধ চার্জিং বন্ধ করে পর্যাপ্ত বৈধ চার্জিং স্টেশন গড়ে তুলতে হবে। পুরনো ব্যাটারি সংগ্রহ ও পরিবেশসম্মত পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থাও বাধ্যতামূলক করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ই-রিকশা নিয়ে দীর্ঘদিনের নীতিগত দ্বিধা কাটিয়ে একটি সমন্বিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। বাহনটি বন্ধ নয়, বরং নিয়মের মধ্যে আনাই হতে পারে বাস্তবসম্মত পথ। মানুষের সাশ্রয়ী যাতায়াত ও জীবিকার প্রয়োজন অস্বীকার না করেই নিরাপদ, নিয়ন্ত্রিত ও পরিবেশসম্মত ই-রিকশা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পরিকল্পনাহীন বিস্তারকে এখনই থামানো না গেলে যে বাহন নগরবাসীর চলাচলের সহায়ক হওয়ার কথা, সেটিই একসময় রাজধানীর জন্য বড় ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।