আতাউর রহমান মারুফ : স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নতুন মুখ আসছেন। বর্তমান উপদেষ্টা পরিষদের মধ্য থেকেই কেউ একজন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন। দু’একদিনের মধ্যেই এ পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। বর্তমান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে অন্য কোন দফতরে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এ সময়ে তাঁকে বিদায় দিতে চাইছেনা সরকার। বরং নির্বাচনকালীন সময়ে আরও শক্তভাবে মন্ত্রণালয়ের হাল ধরার জন্যে উপদেষ্টা পদে পরিবর্তনের কথা ভাবা হচ্ছে। তা ছাড়ার জুলাই আন্দোলনের অন্যতম লড়াকু মুখ ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার পর স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবি উঠেছে জুলাই মঞ্চ, ইনকিলাব মঞ্চসহ কয়েকটি প্লাটফর্ম থেকে। আল্টিমেটামও দেওয়া হয়েছে একাধিকবার। এ প্রেক্ষিতে নির্বাচনকালে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবিচিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা পদে পরিবর্তনা আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র আভাস দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনকালীন আইন-শৃঙ্খলার নিয়ন্ত্রণে জনমনে আস্থা তৈরির লক্ষ্যেই উপদেষ্টা পরিবর্তনের কথা ভাবা হচ্ছে। নতুন মুখ উপদেষ্টা পরিষদের মধ্য থেকেই বেচে নেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে সেত্রের দাবি। সে ক্ষেত্রে সম্ভাবনা রয়েছে, নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানকে দায়িত্ব দেওয়ার।
লে. জেনারেল অব. মোঃ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারে দ্বিতীয় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা। এর আগে ব্রিগেডিয়ার জে. সাখাওয়াত হোসন এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। একটি বিতর্কিত বক্তব্যের জেরে তাঁকে সরিয়ে জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
ড. খলিলুর রহমান একজন দক্ষ কূটনীতিক এবং অর্থনীতিবিদ। তিনি গত বছর থেকে ইউনূস সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা সমস্যাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি ১৯৭৯ সালে সিভিল সার্ভিসে যোগদান করেন এবং তার কর্মজীবনের শুরুতে দক্ষিণ এশিয়া বিভাগ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৫ সালে তিনি জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে যোগ দেন। সেখানে তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অর্থনৈতিক ও আর্থিক কমিটিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে তিনি জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলনে (আঙ্কটাড) বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দেন। এরপর তিনি নিউইয়র্ক ও জেনেভায় জাতিসংঘের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত ছিলেন।
ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন এবং ফ্ল্যাগশিপ প্রকাশনার প্রধান রচয়িতা ছিলেন। তিনি ২০০১ সালে ব্রাসেলস সম্মেলনে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর কর্মসূচি পরিকল্পনার খসড়া তৈরিতে নেতৃত্ব দেন। ড. খলিলুর রহমান ইস্টওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং বর্তমানে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য। এছাড়া, তিনি ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি লতিফুর রহমানের একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি রোহিঙ্গা সমস্যা ও হাইরিপ্রেজেনটেটিভ হিসাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। এই দায়িত্ব পালনের সময় তিনি উপদেষ্টার মর্যাদা এবং সংশ্লিষ্ট সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। গত এপ্রিল মাসের ৯ তারিখে তাঁকে একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পদেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
হাদির হত্যাকারী দেশেও থাকতে পারে, বাইরেও থাকতে পারে
এদিকে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকারী দেশেও থাকতে পারে, বাইরেও থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.)।
গতকাল সোমবার দুপুরে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির ১৮তম সভা শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
হাদি হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি কোথায় আছে, এমন প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, ‘কোথায় আছে জানলে তো তাকে ধরেই ফেলতাম। যদি আমাদের কাছে ওইরকম নিউজটা থাকত, তাহলে তো ধরেই ফেলতাম। দেশেও থাকতে পারে, বাইরেও থাকতে পারে। বাট আমরা এক্সাক্ট লোকেশন যদি জানতে পারতাম, তাহলে তো…।’
যদি ওই আসামি বিদেশে গিয়েও থাকে, সেটা বৈধ পথে নয় বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘সে বৈধ পথে যায়নি। এখন অবৈধ পথে গেছে কি না; এটা তো আমি বলতে পারব না।’
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘হাদির হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচারের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। এই ঘটনার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আমরা বদ্ধপরিকর। এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত কাউকে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। এরই মধ্যে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনার সঙ্গে জড়িত ১০ জনকে যৌথবাহিনী অর্থাৎ পুলিশ, র্যাব, বিজিবি গ্রেপ্তার করেছে। এর মধ্যে রয়েছে হত্যাকাণ্ডের মূলহোতা ফয়সাল করিমের স্ত্রী শাহেদা পারভীন সামিয়া, মা ও বাবা, শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ ও শিপু এবং মোটরসাইকেল মালিক আব্দুল হান্নান।
গত রবিবার সারাদিন গুঞ্জন চলে আপনি পদত্যাগ করছেন, এ বিষয়ে এখন কী বলবেন? জবাবে উপদেষ্টা বলেন, ‘পদত্যাগ করলে তো আর এখানে বসতাম না।’
দেশে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকা ২০ রাজনীতিবিদকে একজন করে গানম্যান দেওয়া হয়েছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘যারা হিটলিস্ট-এ আছে মনে করা হচ্ছে বা ভালনারেবল (ঝুঁকিপূর্ণ), তাদের আমরা অলরেডি হাতিয়ার… গানম্যান দিয়ে দিয়েছি। এ ব্যাপারে আমাদের যে ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশনগুলো আছে— ডিজিএফআই, এনএসআই এবং এসবি— তারা নিজেরা বসে কারা কারা ভালনারেবল, তাদের একটা লিস্টও করা হয়েছে এবং তাদের গানম্যান দেওয়া হয়েছে। অনেকে অবশ্য গানম্যান নিতে চায়নি।’
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে আগমনের দিন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে তিনি বলেন, ‘আগামী ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমান দেশে আগমন উপলক্ষ্যে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এখন সব আপনাকে তো বলে দেওয়া যাবে না। নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’