আন্তর্জাতিক ডেস্ক : কয়েক সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া ‘অবিলম্ব’ যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছে। শনিবার দুই দেশ যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, সীমান্তে চলমান সংঘর্ষ বন্ধে তারা অঙ্গীকারবদ্ধ।
ব্যাংকক থেকে এএফপি এ খবর জানায়।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই ঘোষণাকে স্বাগত জানান। তার মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক বলেন, ‘মহাসচিব একে বেসামরিক মানুষের ভোগান্তি লাঘব এবং স্থায়ী শান্তি অর্জনের পথে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।’
সরকারি হিসাব মতে, তিন সপ্তাহের এই লড়াইয়ে কামান, ট্যাংক, ড্রোন ও যুদ্ধবিমানের ব্যবহারে অন্তত ৪৭ জন নিহত হন। বাস্তুচ্যুত হয় ১০ লাখেরও বেশি মানুষ।
এই সংঘাত প্রায় প্রতিটি সীমান্ত প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিও এই লড়াইয়ের ফলে ভেস্তে যায়।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও শনিবার এই যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়ে দুই পক্ষকেই দ্রুত এই প্রতিশ্রুতি রক্ষার আহ্বান জানান।
থাইল্যান্ডের সীমান্ত চৌকিতে দুই দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের স্বাক্ষরিত ঘোষণা অনুযায়ী, স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা থেকে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী, বেসামরিক নাগরিক ও অবকাঠামোসহ যে কোনো সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সব ধরনের অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ থাকবে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, উভয় পক্ষই সব ধরনের সৈন্য চলাচল স্থগিত রাখতে এবং সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত ঘরে ফেরার সুযোগ দিতে সম্মত হয়েছে।
এছাড়া মাইন অপসারণ ও সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় সহযোগিতার পাশাপাশি আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে আটক ১৮ জন কম্বোডিয়ান সেনাকে ফেরত দেবে থাইল্যান্ড।
থাইল্যান্ডের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী নাথাফন নার্কফানিত বলেন, প্রথম তিন দিন পর্যবেক্ষণ করা হবে যে যুদ্ধবিরতি আসলেই কার্যকর হয়েছে কি না। তিনি একে শান্তিপূর্ণ সমাধানের একটি দ্বার হিসেবে অভিহিত করেন।
বাস্তুচ্যুত ২২ বছর বয়সী কম্বোডিয়ান তরুণী ওম রাকসমি বলেন, ‘যুদ্ধ থামলে মানুষ বাড়ি ফিরতে পারবে দেখে আমি খুব খুশি। তবে আমি এখনই ফেরার সাহস পাচ্ছি না, এখনো খুব ভয় লাগছে।’
সীমান্তের অন্য পাশে থাইল্যান্ডের সিসাকেত প্রদেশের গ্রামপ্রধান খামপং লুয়াকলার্পও সতর্ক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয় যুদ্ধবিরতি হয়তো শেষ পর্যন্ত টিকবে না। তবে আমি সত্যিকারের শান্তি আশা করি।’
দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট আসিয়ান-এর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের জরুরি বৈঠকের পর তিন দিনের সীমান্ত আলোচনার মাধ্যমে এই যুদ্ধবিরতি সম্ভব হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে ‘সদিচ্ছার সাথে’ এটি বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনও এই লড়াই বন্ধে চাপ দিয়ে আসছিল।
বেইজিং জানায়, সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমেই জটিল বিরোধ সমাধান সম্ভব। চীনের শীর্ষ কূটনীতিক ওয়াং ই ২৮ ও ২৯ ডিসেম্বর ইউনান প্রদেশে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া সীমান্ত এবং সেখানে অবস্থিত প্রাচীন মন্দিরগুলোর মালিকানা নিয়ে ঔপনিবেশিক আমলের সীমানা নির্ধারণী বিরোধ থেকে এই সংকটের সূত্রপাত। গত জুলাই মাসেও পাঁচ দিনের লড়াইয়ে অনেকে নিহত হয়েছিলেন। ১৯০৭ সালে ফরাসি প্রশাসনের করা অস্পষ্ট সীমানা নির্ধারণের কারণেই দুই দেশ এই মন্দিরগুলোর ওপর নিজেদের দাবি করে আসছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক আশা প্রকাশ করেন, এই যুদ্ধবিরতি পারস্পরিক আস্থা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করবে।