শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৬ মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
১০ শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

মব সন্ত্রাসে দেড় বছরে নিহত ২৮০ জন

নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। কোনো ঘটনার পূর্বাপর না ভেবে জনতা সংঘবদ্ধ হয়ে হামলা চালাচ্ছে, যার ফলাফল হত্যা, হেনস্তা কিংবা লাঞ্ছনা। এ ধরনের ঘটনাই এখন পরিচিত ‘মব সন্ত্রাস’ নামে। সাম্প্রতিক দেড় বছরে এ সন্ত্রাসে প্রাণ হারিয়েছেন ২৮০ জন।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত মব সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ২৮০ জন। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম পাঁচ মাসেই নিহত হন ৯৬ জন। আগস্টে নিহত হন ২১ জন, সেপ্টেম্বরে ২৮ জন, অক্টোবরে ১৯ জন, নভেম্বরে ১৪ জন এবং ডিসেম্বরে নিহত হন ১৪ জন।

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা স্বীকার করেছেন, মব সন্ত্রাস ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যর্থ হয়েছে। আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, পুলিশের নৈতিক অবস্থান দুর্বল থাকায় মব দমন সম্ভব হয়নি। জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণায় বলা হয়েছে, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ট্রাইব্যুনালের অধীনে সবার ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে।

সরকারি সতর্কতা সত্ত্বেও মব সন্ত্রাস থামেনি। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে আওয়ামী লীগের সাবেক নেতার বাসায় গিয়ে মব চাঁদা আদায় করে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় লুটপাটের ঘটনাও ঘটে। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি শাহাদাত হোসাইন জানান, প্রতিটি ঘটনাই তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে এবং মবের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে।

আসকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মব সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ১৮৪ জন। এর মধ্যে ঢাকায় সবচেয়ে বেশি ৭৮ জন, চট্টগ্রামে ৩২ জন। ২০২৪ সালে নিহত হন ১১৪ জন, ২০২৩ সালে ৪৯ জন, ২০২২ সালে ৩১ জন এবং ২০২১ সালে নিহত হন ২৮ জন।

২০২৫ সালে ‘তৌহিদি জনতা’র নামে শিল্প-সংস্কৃতি কেন্দ্র ভাঙচুর, বাউল সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, এমনকি কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে। প্রথম আলো, ডেইলি স্টার ও ছায়ানট ভবনে হামলা চালানো হয়। বছরের শেষ দিনে বসুন্ধরায় আইনজীবী নাঈম কিবরিয়াকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ভালুকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে পোশাক শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে হত্যা করে লাশে আগুন দেওয়া হয়।

অতীতেও মব সন্ত্রাসের নজির রয়েছে। ২০১৯ সালে ছেলেধরা সন্দেহে উত্তর বাড্ডায় তসলিমা বেগম রেণু হত্যার ঘটনা, ২০১১ সালে সাভারের আমিনবাজারে ছয় ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা এবং একই বছরের জুলাইয়ে নোয়াখালীতে কিশোর মিলন হত্যার ঘটনা জনমনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আইন হাতে তুলে নিয়ে সংঘবদ্ধ আক্রমণ জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক বলেন, আইন নিজের হাতে না তুলে আইনি প্রক্রিয়ায় সমস্যার সমাধান জরুরি। দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলগুলোকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।

সিপিডি চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান বলেন, বই পোড়ানো ও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে হামলার সংস্কৃতি অত্যন্ত বিপজ্জনক, যা নাৎসি জার্মানির সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন গণতান্ত্রিক সময়ে এ ধরনের সংস্কৃতির মুখোমুখি হতে হবে না।

মব সন্ত্রাসে দেড় বছরে নিহত ২৮০ জনের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ছাড়া এ প্রবণতা থামানো সম্ভব নয়।