আন্তর্জাতিক ডেস্ক : সাড়ে চার দশক ধরে টিকে থাকা ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের জন্য বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে চলমান বিক্ষোভ। পাশাপাশি বিদেশি চাপও ক্রমেই বাড়ছে।
বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীরা প্রকাশ্যে ইসলামি শাসন ব্যবস্থার অবসান চাইছে। কারাজ শহরের বাসিন্দা ২৯ বছর বয়সী সিনা বিবিসিকে বলেন, “আমি বাজারে গিয়েছিলাম কেনাকাটা করতে। লোকজন প্রকাশ্যে শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে চিৎকার করে প্রতিবাদ জানাচ্ছিল। আমার মতে, বিক্ষোভ হয়তো দমন করা যাবে, কিন্তু এর রেশ চলতে থাকবে।”
ইস্পাহানের এক বাসিন্দা বলেন, “গত ৫০ বছর ধরে এ শাসনব্যবস্থায় আমার দেশ চলছে। তার ফলাফল দেখুন। আমরা দরিদ্র, বিচ্ছিন্ন ও হতাশ হয়ে গেছি।”
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের ধর্মীয় নেতাদের সিদ্ধান্ত ও তরুণ সমাজের প্রত্যাশার মধ্যে বড় ধরনের ফাঁক তৈরি হয়েছে। লোরেস্তান প্রদেশের বাসিন্দা ২৫ বছর বয়সী মিনা বলেন, “আমি একটি শান্তিপূর্ণ, সাধারণ জীবন চাই। কিন্তু তারা পুরোনো পারমাণবিক কর্মসূচি, অস্ত্রধারী গোষ্ঠীকে সমর্থন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি শত্রুতা চালিয়ে যাচ্ছে। এসব নীতি ১৯৭৯ সালে মানানসই ছিল, কিন্তু এখন আর তা চলবে না।”
২০২২ সালে হিজাব ইস্যুতে মাহশা আমিনির মৃত্যুর পর দেশব্যাপী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লেও সরকার তা নিয়ন্ত্রণে আনে। এরপর আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয় হিজাব আইন। তবে এখন অনেক নারী প্রকাশ্যে হিজাব পরতে অস্বীকার করছেন। ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে এটিকে বড় ধরনের প্রতিবাদ হিসেবে দেখছে আন্তর্জাতিক মহল।
একজন সাবেক ঊর্ধ্বতন সংস্কারপন্থী কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, “ইসলামি প্রজাতন্ত্রের মূল আদর্শ—হিজাব, পোশাক কোড ও পররাষ্ট্রনীতি এখন তরুণদের কাছে আর প্রাসঙ্গিক নয়। তারা মুক্তভাবে জীবনযাপন করতে চায়।”
খামেনির কঠিন সময়
রয়টার্স জানায়, বিক্ষোভকারীদের প্রতি দ্বৈত মনোভাব দেখাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। অর্থনৈতিক ইস্যুর বিক্ষোভকে বৈধ বলা হলেও রাজপথে টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে দমন করা হচ্ছে। ওয়াশিংটন ডিসির মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের পরিচালক অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা বলেন, “দমননীতির মাধ্যমে এর আগেও অনেক প্রতিবাদ মোকাবিলা করেছে ইরানের ধর্মীয় শাসকরা। কিন্তু এখন তা শেষ সীমায় পৌঁছেছে। পরিবর্তন অপরিহার্য মনে হচ্ছে। সরকার পতন সম্ভব, তবে তা নিশ্চিত নয়।”
বিক্ষোভের ব্যাপকতা
গত ডিসেম্বরে ইরানি রিয়ালের দাম রেকর্ড মাত্রায় কমলে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে ধর্মঘট ও বিক্ষোভ শুরু হয়। অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা বলেন, “রিয়ালের পতন শুধু অর্থনৈতিক নয়, বিশ্বাসের পতন।”
তেহরানে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন ইরানের ৩১টি প্রদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, নতুন করে আরও ১৬টি শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, এ পর্যন্ত অন্তত ৪০ জন নিহত এবং ২ হাজার ২৭০ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিক্ষোভ ইরানের শাসনব্যবস্থা ও আধুনিকীকরণের প্রতি গভীর হতাশার প্রতিফলন।
বিদেশি হস্তক্ষেপ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের খামেনি সরকারকে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইরানি নিরাপত্তা বাহিনী যদি বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায়, তবে তিনি তাদের সাহায্য করতে প্রস্তুত। ট্রাম্পের হুমকিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে অনেক ইরানি। তবে ইসফাহানের এক বাসিন্দা বলেন, “আমরা বিদেশি হামলা চাই না। আমাদের মানুষ যথেষ্ট যন্ত্রণা সহ্য করেছে। আমরা শান্তি চাই, ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের বাইরে বিশ্বের সঙ্গে বন্ধুত্ব চাই।”
অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই বিক্ষোভকে “ইরানি জনগণের হাতে তাদের ভবিষ্যত নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত” হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
নির্বাসিত রেজা পাহালভির সমর্থন
ইরানের শেষ রাজা মোহাম্মদ শাহের ছেলে নির্বাসিত রেজা পাহালভি চলমান বিক্ষোভে সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি ইরানের সশস্ত্র বাহিনীকে জনগণের পাশে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ভিডিওবার্তায় রেজা বলেন, “জনগণ ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তুললে এক পর্যায়ে সরকারের সমর্থকরাও তাতে যোগ দেয় এবং সরকার ক্ষমতা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়।”
ইরানের বাইরে তার সমর্থন বাড়লেও দেশের ভেতরে কতটা জোরালো তা এখনো স্পষ্ট নয়।