বিশেষ প্রতিনিধি : মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান। দীর্ঘ সামরিক জীবনে তার ঝুলিতে জমেছে বহু পুরস্কার, পেয়েছেন স্বাধীনতা পদকও। তবে বর্তমানে একাধিক মামলা কাঁধে নিয়ে তিনি কারাগারে। শতাধিক গুমের প্রমাণ মেলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার শুরুর অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি।
প্রসিকিউশন বলছে, দায়িত্ব পালনকালে বেপরোয়া ছিলেন জিয়াউল। আওয়ামী লীগ সরকারের টানা শাসনামলে দেশে গুম-খুন ও দমন-পীড়নের মাস্টারমাইন্ড ছিলেন তিনি। তার ভূমিকা ছিল বহুমাত্রিক। কর্মজীবনে এমন সব অপরাধ করেছেন, যা কল্পনার চেয়েও ভয়াবহ। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে দক্ষতার কারণে তাকে পুরস্কৃত করেছে তৎকালীন সরকার। সেনাবাহিনীর বাইরে রেখেও পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা দাবি করেছেন, জিয়াউলের বিরুদ্ধে কোনো তথ্যপ্রমাণ আনতে পারেনি প্রসিকিউশন। দীর্ঘ সামরিক জীবনে কোনো নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না তিনি। বরং স্বচ্ছতার কারণে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও পেশাগত পুরস্কার পেয়েছেন।
মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় উভয়পক্ষের বক্তব্য শুনেছেন ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেল। ৪ জানুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষ এবং ৮ জানুয়ারি আসামিপক্ষের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। আদেশের জন্য ১৪ জানুয়ারি দিন নির্ধারণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল। ওই দিনই জানা যাবে জিয়াউলের বিচার শুরু হবে কিনা।
তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত ১৭ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনালে ফরমাল চার্জ দাখিল করে প্রসিকিউশন। এতে তিনটি অভিযোগ আনা হয়। প্রথমটি ২০১১ সালের ১১ জুলাই গাজীপুরের পুবাইলে সজলসহ আরও তিনজনকে হত্যা। দ্বিতীয় অভিযোগ ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বরগুনার চরদুয়ানী ইউনিয়নের বলেশ্বর নদীর মোহনায় নজরুল, আলকাছ মল্লিকসহ ৫০ জনকে হত্যা। তৃতীয় অভিযোগে বরগুনা ও বাগেরহাটের সুন্দরবন এলাকায় বনদস্যু দমনের আড়ালে মাসুদসহ আরও ৫০ জনকে হত্যার অভিযোগ।
২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত র্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক ও এডিজি (অপস্) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে এসব অপরাধে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ প্রসিকিউশনের। বিচারবহির্ভূত অসংখ্য গুম-হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নিয়েছেন বলেও চার্জে উল্লেখ করা হয়। বিশেষত ১০৪ জনকে গুমের প্রমাণ মেলায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আবেদন করা হয়েছে।
৪ জানুয়ারি শুনানিতে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম তিনটি অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে পড়ে শোনান। তিনি বলেন, জিয়াউল নিজ হাতে কিংবা অধস্তনদের দিয়ে শতাধিক মানুষকে গুমের পর হত্যা করেছেন। শেখ হাসিনা সরকারের জন্য হুমকি হয়ে ওঠা ভিন্ন রাজনৈতিক মতাবলম্বী ও সাক্ষীদের টার্গেট করতেন তিনি। বরগুনার আলকাছ মল্লিকের ট্রলারে গুম হওয়া লোকদের লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হতো। আলকাছ মাঝি ও তার স্ত্রীকেও একইভাবে হত্যা করা হয়।
গাজীপুরের ঘটনায় প্রসিকিউশন জানায়, র্যাবের গোপন বন্দিশালায় আটক বন্দিদের টঙ্গী হয়ে ভৈরবের বাইপাস সড়কে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হতো। পুবাইলে চারজনকে গুলি করে হত্যার পর নালায় ফেলে দেওয়া হয়। সুন্দরবনে দস্যু দমনের নামে কিলিং মিশন চালাতেন জিয়াউল। সাংবাদিকদের ডেকে এনে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নাটক সাজাতেন।
৮ জানুয়ারি আসামিপক্ষের শুনানিতে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী ও নাজনীন নাহার জিয়াউলের চাকরিজীবনের বর্ণনা তুলে ধরেন। তারা বলেন, ১৯৯১ সালে সেনাবাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত হয়ে কর্মজীবন শুরু করেন জিয়াউল। শৃঙ্খলা ও দৃঢ়তার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। কোনো নেতিবাচক মন্তব্য তার সার্ভিস রেকর্ডে নেই। এজন্য বহু পুরস্কার পেয়েছেন— গার্নিজার অ্যাওয়ার্ড, সংসদ নির্বাচন পদক, সিলভার জুবিলি পদক, সুবর্ণ জয়ন্তী পদক, দাবানল পদক, ডিস্টিংগুইশড ইনস্ট্রাক্টর পদক, জাতিসংঘ পদক, অপারেশন উত্তরণ পদক, স্বাধীনতা পদক, বাংলাদেশ পুলিশ পদক, রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদকসহ একাধিক সম্মাননা।
আইনজীবীরা দাবি করেন, গাজীপুর ও বরগুনার ঘটনায় তাৎক্ষণিক মামলা হয়েছিল। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে জিয়াউল বা র্যাবের কারও নাম উল্লেখ নেই। দীর্ঘ বছর পর নতুন করে অভিযোগ এনে তাকে আসামি করা হয়েছে। এজন্য তারা অব্যাহতি চান।
চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, এত মানুষ মারা গেলেও তদন্ত প্রতিবেদনে নাম আসেনি কারণ পুলিশ কর্মকর্তারা সাহস পাননি। সাক্ষীরাও মুখ খুলতে ভয় পেতেন। এখন মানুষ বিচার চায়। সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়ার জবানবন্দিতে জিয়াউলের উচ্ছৃঙ্খলতার কথা উল্লেখ রয়েছে।
প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী বলেন, আসামিপক্ষ অভিযোগগুলোকে অস্বীকার করে ডিসচার্জ চাইছে। তবে প্রসিকিউশন সুনির্দিষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণ দেখিয়েছে। ফৌজদারি অপরাধে কোনো তামাদি আইন নেই। শত বছর পরও বিচার হতে পারে। তাই ১৫ বছর পর বিচার কেন হচ্ছে— এ প্রশ্ন অবান্তর।