শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৬ মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
১০ শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

অতীতে দায়মুক্তি, জুলাই যোদ্ধাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

মুক্তবাণী ডেস্ক : গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে দায়মুক্তি প্রশ্নটি বারবার সামনে আসছে। সম্প্রতি আইন উপদেষ্টার বক্তব্যের পর বিষয়টি আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। তবে গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ জন্য প্রস্তাবিত দায়মুক্তি আইন ঠিক কোন সময় পর্যন্ত কার্যকর থাকবে— সে বিষয়ে এখনো কোনো স্পষ্টতা নেই।

বাংলাদেশে এর আগেও বিভিন্ন সময়ে আইন ও অধ্যাদেশ জারি করে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্তত তিনবার এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রের বাইরে ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে আইন করে সংশ্লিষ্টদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়। শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা— সব সরকারের আমলেই দায়মুক্তির আইনি নজির রয়েছে। তবে এসব আইন পরবর্তী সময়ে বাতিল হয়েছে বা কার্যকারিতা হারিয়েছে। এ কারণেই বর্তমান প্রেক্ষাপটে ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ দায়মুক্তির প্রয়োজনীয়তা ও সাংবিধানিক যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।

বাংলাদেশে দায়মুক্তির নজির
স্বাধীনতার পর প্রথম দায়মুক্তি দেওয়া হয় বিতর্কিত রক্ষীবাহিনীকে। শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকাকালে ১৯৭২ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য গঠিত এই বাহিনীর কার্যক্রমে দায়মুক্তি দিতে একটি অধ্যাদেশ জারি করেন। ১৯৭৪ সালে সংশোধনী এনে বাহিনীর সব কার্যক্রমকে আইনসংগত ঘোষণা করা হয়। তবে বিচারপতি দেবেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য এই সংশোধনীকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। ১৯৭৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আবার সংশোধনী এনে কিছু নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য শাস্তির বিধান যুক্ত করা হয়। ওই বছরের আগস্টে শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের পর রক্ষীবাহিনী বিলুপ্ত হয় এবং সংশ্লিষ্ট আদেশ বাতিল করা হয়।

১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয়বারের মতো ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ জারি করা হয়, যাতে শেখ মুজিব ও তার পরিবারের হত্যাকারীদের বিচার নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের আমলে সংসদে এটি আইনে পরিণত হয়। পরে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে আইনটি বাতিল করে এবং হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু হয়।

তৃতীয় দফায় দায়মুক্তি আইন করা হয় ২০০৩ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময়, ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’-এ অংশ নেওয়া বাহিনীর সদস্যদের জন্য। ওই অভিযানে ৪০ জনের বেশি মানুষ হেফাজতে মারা যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। এই আইন চ্যালেঞ্জ করে রিট হলে ২০১৫ সালে হাইকোর্ট একে অবৈধ ঘোষণা করে।

বিশেষজ্ঞদের মত
সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক বলেন, বিচার চাওয়ার অধিকার মানুষের প্রথম মৌলিক অধিকার। আইন করে সেই অধিকার বন্ধ করা কখনোই সংবিধানসম্মত হতে পারে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, জাতীয় অখণ্ডতা ও সম্প্রীতি ধরে রাখতে দায়মুক্তির প্রসঙ্গ আসে। তবে বাংলাদেশে বরাবরই তা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। কতিপয় ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা বিশেষ বাহিনীকে রক্ষা করার জন্য দায়মুক্তি আইন করা হয়েছে।

জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের তিন দিনের মাথায় অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এর পর থেকেই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন উপদেষ্টা ও সমন্বয়ক ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ দায়মুক্তির প্রসঙ্গ তুলছেন। বিষয়টি জুলাই সনদেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

সম্প্রতি আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, ফ্যাসিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি দেওয়া প্রয়োজন। তিনি সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদ ও মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী দায়মুক্তি আইনের উদাহরণও তুলে ধরেন।

তবে এই তুলনার যৌক্তিকতা মানছেন না অনেকে। অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, মুক্তিযুদ্ধ ছিল বিদেশি শাসকের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, আর জুলাই আন্দোলন ছিল দেশের ভেতরে একটি সরকারের বিরুদ্ধে। এই দুই প্রেক্ষাপট এক নয়। তিনি বলেন, “আপনি যদি দায়মুক্তির কথা আনেন, তাহলে কীসের জন্য দায় দিচ্ছেন? আপনি কী অপরাধ করলেন যে দায়মুক্তি চান? যদি বলেন, আমি পুলিশ মেরেছি, থানা জ্বালিয়েছি, খুন করেছি, লুট করেছি—আমাকে দায়মুক্তি দিন—এটা তো ন্যায্য নয়।”

একই ধরনের আশঙ্কার কথা বলেছেন শাহদীন মালিকও। তার মতে, বিচার না করে দায়মুক্তি দেওয়ার বিষয়টি ইতিহাসে ভালো চোখে দেখা হবে না। এখন হয়তো বিপ্লবোত্তর এক-দেড় বছর হয়েছে, কিন্তু ১৫ বছর পরে মানুষ প্রশ্ন তুলবে— এত হত্যাকাণ্ডের দায়মুক্তি কেন দেওয়া হলো?