শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৬ মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
১০ শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

প্রতিদিন কলা খাওয়ার উপকারিতা জানুন

লাইফস্টাইল ডেস্ক : রক্তচাপ কমানোর কথা উঠলেই বেশিরভাগ মানুষ ওষুধ, লবণ কমানো আর কড়াকড়ি ডায়েটের কথাই ভাবেন। তবে অনেকের ধারণা, প্রতিদিন খাবারের তালিকায় কলা রাখলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। কিন্তু সত্যিই কি একটি মাত্র ফল এত বড় ভূমিকা রাখতে পারে—এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদরা।

কলা খাওয়ার পর প্রথম ২৪ ঘণ্টায় কী ঘটে:

একটি মাঝারি আকারের কলা খেলে শরীরে প্রায় ৪২০ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম প্রবেশ করে। এই খনিজ উপাদান রক্তনালির দেয়ালের পেশিকে শিথিল করে, যার ফলে রক্তনালি কিছুটা প্রসারিত হয়। এতে রক্ত চলাচল সহজ হয় এবং চাপ কমতে সাহায্য করে। এই প্রক্রিয়াকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ভ্যাসোডাইলেশন।

তবে চিকিৎসকদের মতে, একদিনে বা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রক্তচাপে বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না। কলার আসল উপকার পেতে হলে নিয়মিত ও দীর্ঘমেয়াদে খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হয়।

কলা নিয়ে ভুল ধারণা যেগুলো প্রচলিত:

অনেকেই মনে করেন—

-দিনে একটি কলা খেলেই উচ্চ রক্তচাপ সেরে যাবে
-ডায়াবেটিস থাকলে কলা খাওয়া একেবারেই নিষেধ
-কলায় চিনি বেশি, তাই এটি ক্ষতিকর

বাস্তবে একটি কলা দৈনিক প্রয়োজনীয় পটাশিয়ামের মাত্র প্রায় ১০ শতাংশ জোগায়। গবেষণায় দেখা গেছে, রক্তচাপ কমাতে দিনে অতিরিক্ত ১৫০০ থেকে ৩৫০০ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম গ্রহণ করা হয়েছিল। তাই শুধু কলা খেয়ে সমাধান সম্ভব নয়, বরং এটি একটি সামগ্রিক স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ।

ডায়াবেটিস রোগীরাও পরিমিত পরিমাণে কলা খেতে পারেন। বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রোটিন বা স্বাস্থ্যকর চর্বির সঙ্গে কলা খেলে রক্তে শর্করার হঠাৎ বৃদ্ধি অনেকটাই কমানো যায়।

এক সপ্তাহ নিয়মিত কলা খেলে কিডনির প্রতিক্রিয়া:

টানা কয়েক দিন কলা খাওয়ার ফলে কিডনি ধীরে ধীরে শরীরে পটাশিয়ামের নিয়মিত সরবরাহের সঙ্গে মানিয়ে নেয়। তখন কিডনি অতিরিক্ত সোডিয়াম ও পানি বের করে দিতে শুরু করে। যেহেতু সোডিয়াম শরীরে পানি ধরে রাখে, তাই এটি কমলে রক্তের পরিমাণও কমে আসে এবং চাপ কমতে সাহায্য করে।

এ সময় শরীরের ফোলাভাব কমে, মাথা হালকা লাগে। তবে প্রস্রাবের পরিমাণ কিছুটা বেড়ে যেতে পারে।

এক মাস পর কী ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়:

বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া গেছে, পটাশিয়ামসমৃদ্ধ খাবার নিয়মিত খেলে রক্তচাপের ওপর স্পষ্ট প্রভাব পড়ে। ৩৩টি গবেষণার বিশ্লেষণে দেখা গেছে—

-সিস্টোলিক রক্তচাপ গড়ে ৩–৫ পয়েন্ট কমে
-ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ গড়ে ২–৩ পয়েন্ট কমে
-যাদের আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপ ছিল, তাদের ক্ষেত্রে এই সুফল আরও বেশি দেখা গেছে।

তবে এসব গবেষণা শুধুমাত্র কলা নিয়ে করা হয়নি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পটাশিয়াম সাপ্লিমেন্ট বা ডিএএসএইচ ডায়েট অনুসরণ করা হয়েছিল, যেখানে ফল, শাকসবজি ও কম চর্বিযুক্ত দুগ্ধজাত খাবার অন্তর্ভুক্ত থাকে। এই খাদ্যতালিকায় কলা গুরুত্বপূর্ণ হলেও একমাত্র উপাদান নয়।

রক্তচাপ ছাড়াও পটাশিয়ামের অন্যান্য উপকারিতা:

নিয়মিত পটাশিয়াম গ্রহণের ফলে—

-হৃদযন্ত্রের ওপর চাপ কমে
-স্ট্রোকের ঝুঁকি প্রায় ২৪ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে
-রক্তনালি নমনীয় থাকে
-মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন উন্নত হয়
-দীর্ঘমেয়াদে এসব পরিবর্তন সামগ্রিক জীবনমান ভালো রাখতে সহায়তা করে।

কতটা কলা খাওয়া উচিত:

চিকিৎসকদের মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক পটাশিয়ামের চাহিদা প্রায় ৩৫০০ থেকে ৪৭০০ মিলিগ্রাম। শুধু কলা দিয়ে এই প্রয়োজন পূরণ করতে গেলে দিনে ৮–১০টি কলা খেতে হবে, যা বাস্তবসম্মত নয়।

তাই প্রতিদিন ১ থেকে ২টি কলা খাওয়াই যথেষ্ট। পাশাপাশি পালং শাক, মিষ্টি আলু, ডাল, অ্যাভোকাডো, নারকেল পানি, টমেটো ও শিমের মতো পটাশিয়ামসমৃদ্ধ খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা জরুরি।

সবশেষে বলা যায়, প্রতিদিন কলা খাওয়া অবশ্যই ভালো অভ্যাস, তবে এটিকেই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের একমাত্র সমাধান ভাবা ঠিক নয়। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও সুষম খাদ্যই এখানে মূল চাবিকাঠি।

সূত্র- পিঞ্চ অব হেলথ