নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশে ২০২৫ সালে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের ঘিরে সংঘটিত অধিকাংশ ঘটনাই ধর্মীয় বিদ্বেষ বা সাম্প্রদায়িক নয়, বরং সাধারণ অপরাধের আওতাভুক্ত—এমন তথ্য উঠে এসেছে পুলিশের এক বছরব্যাপী পর্যালোচনায়।
পুলিশ সদর দপ্তরের প্রস্তুত করা এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে, অপরাধ দমনে স্বচ্ছতা, নির্ভুলতা ও দৃঢ়তার নীতিতে অটল রয়েছে সরকার।
প্রেস উইং জানায়, জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত সারা দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মোট ৬৪৫টি ঘটনার তথ্য যাচাই করা হয়েছে। এসব তথ্য এসেছে থানায় দায়ের করা মামলা (এফআইআর), সাধারণ ডায়েরি (জিডি), অভিযোগপত্র এবং চলমান তদন্তের হালনাগাদ নথি থেকে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মোট ঘটনার মধ্যে মাত্র ৭১টিতে সাম্প্রদায়িক উপাদান পাওয়া গেছে। বিপরীতে, ৫৭৪টি ঘটনা সাম্প্রদায়িক নয় বলে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। অর্থাৎ, সংখ্যালঘুদের ঘিরে সংঘটিত অধিকাংশ ঘটনাই ধর্মীয় বিদ্বেষ নয়, বরং সাধারণ অপরাধপ্রবণতার ফল।
সাম্প্রদায়িক উপাদানযুক্ত ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে মন্দির ভাঙচুর (৩৮), মন্দিরে চুরি (১), অগ্নিসংযোগ (৮), হত্যা (১) এবং অন্যান্য অপরাধ (২৩)। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ৫০টিতে, গ্রেপ্তার হয়েছে ৫০ জন এবং অন্যান্য পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে ২১ ক্ষেত্রে।
অন্যদিকে, সাম্প্রদায়িক নয় এমন ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রতিবেশী বিরোধ (৫১), জমিসংক্রান্ত দ্বন্দ্ব (২৩), চুরি (১০৬), পূর্বশত্রুতা (২৬), অস্বাভাবিক মৃত্যু (১৭২), ধর্ষণ (৫৮) এবং অন্যান্য অপরাধ (১৩৮)। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ৩৯০টিতে, অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা হয়েছে ১৫৪টিতে, গ্রেপ্তার হয়েছে ৪৯৮ জন এবং অন্যান্য পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে ৩০ ক্ষেত্রে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধর্মীয় উপাসনালয় বা সংবেদনশীল বিষয় জড়িত থাকলে পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে। শত শত ঘটনায় মামলা হয়েছে, অনেক ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে, আর কিছু ঘটনায় তদন্ত এখনো চলমান।
জাতীয় পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতি বছর দেশে সহিংস অপরাধে গড়ে প্রায় ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। প্রতিটি মৃত্যু একটি ট্র্যাজেডি। তবে সহিংস অপরাধ সব সম্প্রদায়কেই প্রভাবিত করে—ধর্ম, জাতিগোষ্ঠী বা ভৌগোলিক সীমা নির্বিশেষে।
প্রেস উইংয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যাচ্ছে। উন্নত পুলিশিং, গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়, দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা এবং জবাবদিহি বাড়ানোর ফলে অগ্রগতি হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও অন্যান্য বিশ্বাসের মানুষের দেশ। সবাই সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করেন। প্রতিটি সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা শুধু সাংবিধানিক দায়িত্ব নয়, নৈতিক দায়িত্বও।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে, এই প্রতিবেদন কোনো সমস্যাকে অস্বীকার করে না, আবার নিখুঁত পরিস্থিতির দাবিও করে না। বরং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে ঘিরে অপরাধপ্রবণতার একটি তথ্যভিত্তিক ও বাস্তব চিত্র তুলে ধরাই এর উদ্দেশ্য।
প্রেস উইংয়ের মতে, গঠনমূলক সমালোচনা, দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে এগুলেই অগ্রগতি সম্ভব। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা দিয়ে দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নির্ধারিত হয় না; বরং এসব ঘটনা মোকাবিলায় সামষ্টিক প্রচেষ্টাই মূল বিবেচ্য।