নিজস্ব প্রতিবেদক : জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সব প্রস্তুতি নিলেও শেষ পর্যন্ত তারা ভোটের মাঠে থাকবে কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন এবং সব দল সমান সুযোগ পাচ্ছে না— এমন অভিযোগ তুলেছে দলটি।
এনসিপির মুখপাত্র ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া গত রোববার সংবাদ সম্মেলনে বলেন, নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে। আর গতকাল অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে তিনি জানান, যেকোনো সিদ্ধান্তের জন্য প্রস্তুত রয়েছে এনসিপি।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে বিএনপির প্রতি ইসির পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ করেন এনসিপি নেতারা। দ্বৈত নাগরিকত্ব, ঋণখেলাপি এবং আচরণবিধি ভঙ্গের বিষয়ে ইসি সুস্পষ্টভাবে বিএনপির পক্ষাবলম্বন করছে বলে তাঁদের দাবি।
গতকাল বিকেলে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল যমুনায় গিয়ে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। দলে ছিলেন মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারি মনিরা শারমিন ও আইনি সহায়তাবিষয়ক উপকমিটির প্রধান জহিরুল ইসলাম মূসা। এ সময় সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবও উপস্থিত ছিলেন।
সাক্ষাৎ শেষে নাহিদ ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, “সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যে পরিবেশ দরকার, নির্বাচন কমিশন ও মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষ আচরণ আমরা মাঠে দেখছি না। নির্বাচন যদি পক্ষপাতদুষ্ট হয়, তার দায় অন্তর্বর্তী সরকারের ওপরই আসবে।”
এনসিপি নেতাদের দাবি, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের সক্ষমতা হারিয়েছে। জনগণের আস্থা নষ্ট হয়েছে। চট্টগ্রামের এক বিএনপি প্রার্থীর ক্ষেত্রে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার ঋণখেলাপি থাকা সত্ত্বেও তাঁকে বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। জামানতকারীতে ঋণখেলাপি হিসেবে গণ্য না করে আইনের ব্যাখ্যা পরিবর্তন করা হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁদের। এনসিপির মতে, সংবিধান ও আইনকে ইসি নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করছে, যা তাদের এখতিয়ারের বাইরে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিপির একজন যুগ্ম সদস্যসচিব বলেন, “আমরা অনেক আগে থেকেই ইসি পুনর্গঠনের দাবি জানিয়ে আসছি। এই দাবিতে শেষমেশ ভোট বর্জনের ঘোষণা আসতে পারে।”
এনসিপির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সেলের কো-লিড ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আলাউদ্দীন মোহাম্মদ বলেন, “গণ-অভ্যুত্থানের পর সবচেয়ে বড় প্রতারণা করেছে নির্বাচন কমিশন। তারা লজ্জাজনকভাবে একটি পক্ষের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে।”
এনসিপির অভিযোগ, তাদের প্রার্থীদের শোকজ দেওয়া হচ্ছে পক্ষপাতদুষ্টভাবে। আসিফ মাহমুদ বলেন, “আমাদের প্রার্থীদের শোকজ দেওয়া হচ্ছে মিডিয়া ট্রায়ালের উদ্দেশ্যে। অথচ অন্য দলের প্রার্থীরা দলের নাম, মার্কা বা নেতাদের ছবি ব্যবহার করে প্রচারণা চালাচ্ছেন, যা আচরণবিধি লঙ্ঘন। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।”
দলীয় সূত্র জানায়, বিএনপির ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিক প্রার্থীরা নির্বাচনে থাকলে এনসিপি ভোটের মাঠ থেকে সরে দাঁড়াতে পারে। এরপর তারা আন্দোলনের পথে যেতে পারে। মনিরা শারমিন বলেন, “আমরা সুষ্ঠু নির্বাচন চাই। আইনি পথে হাঁটব, ইসির সঙ্গে বসব। তারপরও কাজ না হলে অন্য পথ ভাবতে হবে।”
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানায়, বৈঠকে এনসিপি নেতারা তাঁদের উদ্বেগ তুলে ধরেন। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, নিরপেক্ষতা নিশ্চিতের জন্য লটারির মাধ্যমে মাঠ প্রশাসনে রদবদল করা হয়েছে। এতে কোনো পক্ষপাতের সুযোগ নেই। তিনি আরও বলেন, “এই নির্বাচন দেশের ভাগ্য নির্ধারণের নির্বাচন। সুষ্ঠু হতেই হবে।”
এনসিপি নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা ও প্রার্থীদের প্রচারের জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে ‘ক্রাউড ফান্ডিং’ শুরু করেছে। রাজধানীর বাংলামোটরে রূপায়ণ ট্রেড সেন্টারে দলের অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গতকাল বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
তিনি জানান, এনসিপির প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ প্রার্থী কেন্দ্রীয়ভাবে এই ক্রাউড ফান্ডিংয়ের আওতায় নির্বাচনী ব্যয় পরিচালনা করবেন। এর মাধ্যমে অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যাবে। দাতারা চাইলে সরাসরি এনসিপিকে অথবা নির্দিষ্ট কোনো প্রার্থীকে অনুদান দিতে পারবেন।