সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৩ ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
২৭ শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

এআইকে ‘অস্ত্র’ বানাচ্ছে সাইবার অপরাধীরা, মোকাবিলায় ইন্টারপোলের নীরব যুদ্ধ

মুক্তবাণী ডেস্ক : নিখুঁত ভাষার ফিশিং ইমেইল থেকে শুরু করে সরকারি কর্মকর্তাদের ভুয়া ভিডিও পর্যন্ত সব কিছুতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সাইবার অপরাধের ধরন দ্রুত বদলে দিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সিঙ্গাপুরে উচ্চপ্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে অপরাধীদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে ইন্টারপোল।

সিঙ্গাপুর  থেকে এএফপি জানায়, সংগঠনটির সাইবার অপরাধবিষয়ক পরিচালক নীল জেটন এএফপিকে বলেন, ‘সাইবার অপরাধীদের হাতে এআইয়ের অস্ত্রীকরণই বর্তমানে সবচেয়ে বড় হুমকি।’ তিনি বলেন, অপরাধীরা প্রযুক্তিটি ‘যেভাবে পারছে সেভাবেই’ ব্যবহার করছে।

ইন্টারপোলের বহুমুখী সাইবার অপরাধ দমনকেন্দ্রে বিশেষজ্ঞরা বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য র‌্যানসমওয়্যার হামলা বা ছদ্মবেশী প্রতারণা ঠেকানোর চেষ্টা করছেন। জেটনের মতে, সাইবার হামলার ‘অপরিসীম পরিমাণ’ই সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, এবং ভবিষ্যতে এর পরিমাণ আরও বাড়বে।

এআই প্রযুক্তির সাহায্যে অপরাধীরা এখন সহজেই পরিচিত ব্যক্তিদের কণ্ঠ ও ভিডিওর উন্নতমানের নকল তৈরি করতে পারছে, যা ব্যবহার করা হচ্ছে ভুয়া বিনিয়োগ বা প্রতারণামূলক প্রচারণায়। এমনকি কম দক্ষ অপরাধীরাও ডার্ক ওয়েব থেকে প্রস্তুত হ্যাকিং বা প্রতারণার সরঞ্জাম কিনতে পারছে। ফলে স্মার্টফোন ব্যবহারকারী যে কেউই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারেন।

এই কেন্দ্রটি ইন্টারপোল গ্লোবাল কমপ্লেক্স ফর ইনোভেশনের অংশ, যা সিঙ্গাপুর বোটানিক গার্ডেনসের কাছাকাছি অবস্থিত। ফ্রান্সের লিওঁ শহরের পর এটিই সংস্থাটির দ্বিতীয় সদরদপ্তর।

এখানে সাইবার ফিউশন সেন্টার নামে একটি কেন্দ্র রয়েছে, যেখানে ১৯৬টি সদস্য দেশের মধ্যে অনলাইন হুমকি সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করা হয়। একই কমপ্লেক্সে উদীয়মান সাইবার হুমকি বিশ্লেষণের ইউনিট, ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য কমান্ড ও সমন্বয় কেন্দ্রও রয়েছে। 
সাইবার ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সমন্বয়ক ক্রিশ্চিয়ান হেগেন বলেন, তদন্তকারীরা এমন এক বিশাল অপরাধী নেটওয়ার্কের মুখোমুখি, যারা নানা ধরনের আক্রমণপদ্ধতি ব্যবহার করে এবং অত্যন্ত সৃজনশীলভাবে কাজ করে। তিনি বলেন, ‘এটি মূলত চুরি হওয়া তথ্য, গুপ্তচরবৃত্তি ও ম্যালওয়্যার কেনাবেচার একটি পুরো কালোবাজার।’

ইন্টারপোল তাদের সক্ষমতা বাড়াতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তুলেছে।

গত বছর এশিয়ায় পরিচালিত ‘অপারেশন সিকিউর’-এ ২৬টি দেশ যৌথভাবে ২০ হাজারের বেশি ক্ষতিকর আইপি ঠিকানা ও ডোমেইন নিষ্ক্রিয় করে। আফ্রিকায় পরিচালিত ‘অপারেশন সেরেঙ্গেটি ২.০’-তে ১ হাজার ২০৯ জন সাইবার অপরাধী গ্রেপ্তার হয়; প্রায় ৮৮ হাজার ভুক্তভোগীকে লক্ষ্য করে চালানো অপরাধের সঙ্গে জড়িত নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া হয় এবং ৯ কোটি ৭০ লাখ ডলারের বেশি অর্থ উদ্ধার করা হয়।

কমপ্লেক্সটির প্রধান তোশিনোবু ইয়াসুহিরা বলেন, ডিপফেক প্রযুক্তির অগ্রগতি ইতোমধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে, তবে ভবিষ্যতে মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে—এমন এআই নিয়ে আরও বড় দুশ্চিন্তা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘এআইয়ের তো আত্মা বা হৃদয় নেই—তাহলে দায় কার ওপর বর্তাবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।’

ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা অপরাধীদের চেয়ে এগিয়ে থাকতে ভার্চ্যুয়াল রিয়্যালিটি, অগমেন্টেড রিয়্যালিটি ও কোয়ান্টাম প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়েও কাজ করছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এই লড়াই সাধারণ মানুষের চোখে খুব একটা পড়ে না, কিন্তু বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।