শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৮ ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
৩ রমজান, ১৪৪৭ হিজরি

ছায়া মন্ত্রিসভার সুফল পেতে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা জরুরি

বিশেষজ্ঞ মত : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। গত মঙ্গলবার নতুন সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ নেওয়ার আগেই সামনে এসেছে ১১ দলীয় জোটের ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ (শ্যাডো ক্যাবিনেট) গঠনের ঘোষণা। এরই মধ্যে ওই জোটের দু-একজন নেতার পক্ষ থেকে এমন ইঙ্গিত মিলেছে। বিষয়টিকে অনেকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও দেশের প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে চ্যালেঞ্জ বলে মনে করা হচ্ছে। তারা বলছেন, ছায়া মন্ত্রিসভা চালু হলে সরকারের ওপর কার্যকর নজরদারি বাড়বে, নীতিনির্ধারণে গঠনমূলক সমালোচনার সুযোগ তৈরি হবে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও সুস্পষ্ট নীতিমালা না থাকলে এ ধারনা অকার্যকর হয়ে পড়বে।

গত রোববার ১১ দলীয় জোটের দুই নেতা সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির ও এনসিপির নেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ছায়া মন্ত্রিসভার বিষয়টি জানান। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এ ঘোষণা দেওয়ার পর রাজনীতির আলোচনার পালে নতুন হাওয়া লাগে। আসিফ মাহমুদ তার পোস্টে লেখেন, ‘আমরা ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত এবং সার্বিক কার্যক্রমে ওয়াচডগ হিসেবে কাজ করবে ছায়া মন্ত্রিসভা।’

এদিকে, এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে বিএনপিও। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছায়া মন্ত্রিসভা আছে; দেশেও এমন কিছু হলে ইতিবাচকভাবে দেখবে বিএনপি।’ দলের স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রত্যাশা, দেশের স্বার্থে সংসদে গণতান্ত্রিক আচরণ করবে বিরোধী দল।

ছায়া মন্ত্রিসভার ধারণাটি এসেছে যুক্তরাজ্যের ওয়েস্টমিনস্টার সংসদীয় ব্যবস্থা থেকে, যা সেখানে ‘শ্যাডো ক্যাবিনেট’ নামে পরিচিত। এ রীতি অনুযায়ী বিরোধী দল একটি ছায়া সরকার গঠন করে। এর কাজ হলো সরকারের নীতি পর্যবেক্ষণ, সমালোচনা ও বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া। এর লক্ষ্য হচ্ছে সংসদীয় গণতন্ত্র আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা। যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের ওয়েবসাইটে ছায়া মন্ত্রিসভার সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, এটি বিরোধীদলীয় নেতার নির্বাচিত একদল জ্যেষ্ঠ মুখপাত্র, যারা সরকারের মন্ত্রিসভার কার্যক্রমের প্রতিচ্ছবি হিসেবে কাজ করেন। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি সদস্যকে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বা বিষয়ে নেতৃত্বের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, প্রশ্ন তোলা ও চ্যালেঞ্জ জানান। এভাবে দেশের বিরোধী দল নিজেকে একটি ‘অপেক্ষমাণ বিকল্প সরকার’ হিসেবে প্রস্তুত রাখে। অর্থাৎ মন্ত্রিসভায় যেমন বিভিন্ন দপ্তরের মন্ত্রী থাকেন, তেমনি ছায়া মন্ত্রিসভায়ও বিরোধী দলের বিভিন্ন সদস্যকে একেকটি দপ্তরের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মন্ত্রী কী করছেন, তার ওপর নজর রাখেন তিনি। আবার ছায়া মন্ত্রিসভায় সরকারের মন্ত্রীদের সবার বিপরীতে ছায়া মন্ত্রী না-ও থাকতে পারেন। এটি বিরোধী দলের সিদ্ধান্ত যে, তারা কোন বিষয়ে ছায়ামন্ত্রী রাখতে চায়।

দেশের জন্য এটি নতুন ধারণা হলেও সরকারের সহনশীলতা ও বিরোধী দলের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত করা গেলে ছায়া মন্ত্রিসভা অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ছায়া মন্ত্রিসভা থাকলে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের ওপর বিরোধী পক্ষের কাঠামোবদ্ধ তদারকি গড়ে ওঠে, যা দুর্নীতির সম্ভাবনা কমাতে এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা বাড়াতে সহায়তা করে। এতে সরকার এক ধরনের ইতিবাচক চাপের মধ্যে থাকে এবং বিকল্প প্রস্তাব ও সমালোচনা থেকে শেখার সুযোগ পায়। একই সঙ্গে বিরোধী দলও শান্তিপূর্ণ ও প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে নিজেদের নীতি ও দক্ষতা তুলে ধরার প্ল্যাটফর্ম পায়।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. স ম আলী রেজা কালবেলাকে বলেন, ‘পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রে ছায়া মন্ত্রিসভা কোনো নতুন ধারণা নয়। যেখানে শক্তিশালী নাগরিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি রয়েছে, সেখানে এটি একটি প্রতিষ্ঠিত চর্চা। ছায়া মন্ত্রিসভা সরকারের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করে এবং বিরোধী দলকে গঠনমূলক সমালোচনার একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দেয়। বিরোধী দলের মূল কাজই হলো সরকারের সমালোচনা করা। তবে সেটি হতে হবে কনস্ট্রাকটিভ বা গঠনমূলক, যাতে সমালোচনার মধ্য দিয়েই সরকারকে সহযোগিতা করা যায়।’ তিনি বলেন, ‘এই ব্যবস্থার জন্য সরকারের মধ্যে সহনশীলতা অত্যন্ত জরুরি। বিরোধী দলকে সমালোচনা ও বিকল্প প্রস্তাব দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে।’

ছায়া মন্ত্রিসভার কার্যকারিতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আলী রেজা বলেন, ‘সরকার যখন বাজেট বা বড় কোনো নীতি প্রস্তাব করবে, তখন ছায়া মন্ত্রিসভার সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যরাও বিকল্প বাজেট বা প্রস্তাব জনগণের সামনে উপস্থাপন করতে পারবেন। এতে জনপরিসরে তুলনামূলক আলোচনা তৈরি হবে এবং সরকারও প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো গ্রহণ করার সুযোগ পাবে। ফলে এটি সরকারকে আরও সতর্ক, প্রস্তুত ও জবাবদিহিমুখী করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে বিরোধী দলও নিজেদের দক্ষতা ও পারফরম্যান্স প্রদর্শনের একটি শান্তিপূর্ণ ও প্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম পায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই প্রক্রিয়া কার্যকর করতে হলে দুপক্ষেরই সদিচ্ছা প্রয়োজন। বিরোধী দলকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে এবং সরকারকে বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের যথেষ্ট স্পেস দিতে হবে। বিরোধী দল যদি বারবার অসহযোগিতার পথে হাঁটে, অথবা কাজ করার সুযোগ না পায়, তাহলে পার্লামেন্টারি কাঠামোয় তাদের নির্ধারিত ভূমিকা দুর্বল হয়ে যাবে।’ তার ভাষায়, ‘এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে সরকার সব সময় একটি ইতিবাচক চাপের মধ্যে থাকবে, আরও সচেতনভাবে কাজ করবে এবং গঠনমূলক কর্মসম্পাদনের দিকে এগোবে। এটি সরকারকে এক ধরনের সফট বাধ্যবাধকতার মধ্যে নিয়ে আসে, যা গণতান্ত্রিক জবাবদিহি শক্তিশালী করতে সহায়ক।’

ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করা হলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতির সম্ভাবনা কমানোর ক্ষেত্রে এটি একটি কার্যকর উদ্যোগ হতে পারে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আইনুল ইসলাম। কালবেলাকে তিনি বলেন, ‘প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য আলাদা ছায়ামন্ত্রী ও একটি টিম থাকবে, যারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে। এর ফলে সরকারের কাজের ওপর একটি শক্তিশালী ও প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি তৈরি হবে। বিরোধী দলের প্রতিনিধিরা কার্যত সরকারের মধ্যে আরেকটি নজরদারি কাঠামো হিসেবে কাজ করবেন।’ তিনি বলেন, ‘এই ব্যবস্থায় সংশ্লিষ্ট খাতের দক্ষ ও প্রাসঙ্গিক ব্যক্তিরা যুক্ত থাকলে মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম আরও জবাবদিহিমূলক হবে। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা, দুর্নীতি কমানো এবং নীতিনির্ধারণে গুণগত উন্নতি আনার জন্য এটি একটি ভালো চর্চা হতে পারে।’

তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু প্রক্রিয়াগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে উল্লেখ করে আইনুল ইসলাম জানান, ছায়া মন্ত্রিসভার সদস্যদের কাজ করতে হবে প্রায় পূর্ণকালীন দায়িত্বের মতো; কিন্তু সাধারণত তাদের জন্য আলাদা আর্থিক সুবিধা, প্রশাসনিক সহায়তা বা সেক্রেটারিয়াল সাপোর্ট থাকে না। পর্যাপ্ত লজিস্টিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ছাড়া তাদের পক্ষে কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করা কঠিন হবে। তাই এই কাঠামো কার্যকর করতে হলে সহায়ক নীতিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, এ ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেশে এখনো গড়ে ওঠেনি, তাই বিষয়টি নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা ও নীতিগত প্রস্তুতি প্রয়োজন। তবে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এর সুফল উল্লেখযোগ্য হতে পারে। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা বাড়বে, আমলাতন্ত্রের জবাবদিহি শক্তিশালী হবে এবং নীতিগত সিদ্ধান্তে বিকল্প মতামত যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। সব মিলিয়ে ছায়া মন্ত্রিসভা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারলে সরকার ও বিরোধী দল উভয়ের অংশগ্রহণে একটি সমন্বিত ও অংশগ্রহণমূলক শাসন ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে, যা গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে।