বুধবার, ১৮ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৪ চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
২৮ রমজান, ১৪৪৭ হিজরি

মহান শহীদ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক: রক্তঝরা ইতিহাসের দিন ২১ ফেব্রুয়ারি—মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস—আজ বাঙালি জাতির হৃদয়ে গভীর শোক ও অনির্বচনীয় গৌরবের স্মারক হয়ে ফিরে এসেছে। পলাশ ও শিমুলের অগ্নিরঙা ফুলে সজ্জিত এই দিনে জাতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে সেই বীর শহীদদের, যাঁরা ১৯৫২ সালের এই দিনে মাতৃভাষা বাংলার অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন। চারদিকে আজও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে অমর সংগীত—“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?”

রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছিল তৎকালীন পূর্ব বাংলার রাজপথ। শান্তিপূর্ণ মিছিলরত ছাত্রদের ওপর পুলিশের নির্বিচার গুলিবর্ষণে ইতিহাসে রচিত হয় এক বেদনাময় কিন্তু গৌরবমণ্ডিত অধ্যায়। সালাম, বরকত, রফিক, শফিউর, জব্বারসহ অসংখ্য নাম না জানা শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয় আমাদের ভাষার অধিকার। তাঁদের রক্তেই বাংলা আজ স্বাধীন পরিচয়ের ভিত্তি ও জাতিসত্তার প্রাণ।

এই মহান আত্মত্যাগের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে জাতিসংঘ ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যা এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভাষাগত অধিকার ও বৈচিত্র্যের প্রতীক হিসেবে পালিত হয়।

প্রতিবছরের মতো আজও একুশের প্রথম প্রহরে রাত ১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার-এ পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মাধ্যমে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে প্রভাতফেরি, কালো ব্যাজ ধারণ, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে।

এই দিনটি উপলক্ষে দেশে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হচ্ছে এবং উত্তোলন করা হচ্ছে কালো পতাকা। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী পৃথক বাণীতে ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

ভাষা আন্দোলনের পটভূমি

ভাষার দাবিতে আন্দোলনের সূচনা হয় ১৯৪৭ সালের শেষ দিকে ঢাকায়। ১৯৪৮ সালে আন্দোলন আরও সংগঠিত রূপ নেয় এবং ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তা বিস্ফোরিত হয়ে ওঠে। ওইদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর ছাত্ররা ১৪৪ ধারা অমান্য করে মিছিল বের করলে পুলিশ গুলি চালায়, এতে কয়েকজন ছাত্র শহীদ হন। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি ছাত্র ও সাধারণ মানুষ আবারও প্রতিবাদে রাজপথে নামে এবং মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে শহীদদের জন্য গায়েবি জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

শহীদদের স্মরণে ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতারাতি সেখানে একটি অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হলেও ২৬ ফেব্রুয়ারি তা ভেঙে ফেলা হয়। তবে এই দমনপীড়ন আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে পারেনি; বরং আরও শক্তিশালী করে তোলে। পরবর্তীতে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিজয়ী হলে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জোরালো হয়। ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। পরে ১৯৮৭ সালে জাতীয় সংসদে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন পাস হয়ে প্রশাসনে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি অর্জন

একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ শুরু হয় প্রবাসী বাঙালিদের হাত ধরে। ১৯৯৮ সালে কানাডাপ্রবাসী দুই বাঙালি জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনানের কাছে আবেদন জানান। পরবর্তীতে বিভিন্ন দেশের সমর্থন নিয়ে প্রস্তাবটি এগিয়ে নেওয়া হয়। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো-এর প্যারিস অধিবেশনে প্রস্তাবটি গৃহীত হয় এবং ২০০০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালন শুরু হয়।

পরবর্তীতে ২০১০ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদও প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে অনুমোদন করে, যা দিবসটির বৈশ্বিক মর্যাদা আরও সুদৃঢ় করে।