সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৪ ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
১৯ রমজান, ১৪৪৭ হিজরি

নতুন আয়াতুল্লাহ : ইরানের রেজিম ও চলমান যুদ্ধ কোন দিকে যাবে

মুক্তবাণী ডেস্ক : ­বছরের পর বছর ধরে ইরানের রেজিমবিরোধী গণমাধ্যম ও বিশ্লেষকেরা ধারণা করে আসছিলেন, সম্প্রতি হত্যাকাণ্ডে নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির খুব কম দেখা দেওয়া ছেলে মুজতবা হোসেইনি খামেনি হয়তো একদিন ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ পদে বসতে পারেন। তবে ইরানের ভেতরে এই ধারণাটি সব সময়ই অনেক বেশি স্পর্শকাতর ছিল।

ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বংশানুক্রমিক শাসনের বিরোধিতায়। ১৯৭৯ সালে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে উৎখাত করা বিপ্লব কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন ছিল না; এটি ছিল রাজতন্ত্রের সঙ্গে এক মৌলিক বিচ্ছেদ। নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা নিজেদের বৈধতা দাঁড় করায় ধর্মীয় আলেমদের কর্তৃত্ব, বিপ্লবী প্রতিষ্ঠান এবং ‘ভেলায়াতে ফকিহ’ বা ইসলামী আইনজ্ঞের অভিভাবকত্বের মতবাদের ওপর। এ কারণেই পিতা থেকে পুত্রের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের ধারণাটি অত্যন্ত বিতর্কিত।

তবুও সেটাই ঘটেছে। আজ সোমবার ভোরে ইরানের এসেম্বলি অব এক্সপার্টস আনুষ্ঠানিক বিবৃতি জানায়, ৫৬ বছর বয়সী মুজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত এল এমন এক সময়ে, যখন ইরানে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে মার্কিন–ইসরায়েলি আগ্রাসন চলছে। যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল পরিচালিত হামলায় নিহত হন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং শাসনব্যবস্থার আরও বহু নেতা। যুদ্ধের সময় রাজনৈতিক বৈধতা প্রায়ই আদর্শিক তর্কের চেয়ে চাপের কাছে নতি স্বীকার করে। এখন প্রশ্ন হলো, মুজতবা খামেনির এই নিয়োগ যুদ্ধের গতিপথে কী প্রভাব ফেলবে এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ভবিষ্যতের জন্য এর অর্থ কী হবে।

ইরানের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শহীদ হওয়ার ধারণা গভীর প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে। এর উৎস মূলত শিয়া ইসলামের কেন্দ্রীয় ঐতিহাসিক বর্ণনায়—৬৮০ খ্রিস্টাব্দে কারবালার যুদ্ধে ইমাম হোসাইনের শাহাদাত। শিয়া ধর্মতত্ত্বে এটি অত্যাচার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ প্রতিরোধের প্রতীক। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে হোসাইনের এই আত্মত্যাগ স্মরণ করা হয়েছে আশুরার শোকানুষ্ঠান এবং কারবালার ট্র্যাজেডি পুনরাভিনীত বিভিন্ন ধর্মীয় নাট্যমঞ্চনার মাধ্যমে। এসব আচার মানুষের মনে গভীরভাবে প্রোথিত করেছে এই ধারণা—নৈতিক বিজয় অনেক সময় বেঁচে থাকার মধ্য নয়, বরং আত্মত্যাগের মধ্যেই নিহিত।

ইসলামী প্রজাতন্ত্র আধুনিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এই ধর্মীয় ঐতিহ্যকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করছে। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় দেশটির নেতৃত্ব সংঘাতটিকে কারবালার এক আধুনিক পুনরাবৃত্তি হিসেবে তুলে ধরে। সেখানে ইরানি সৈন্যদের দেখানো হয় ইমাম হোসাইনের অনুসারী হিসেবে, যারা এক নতুন অত্যাচারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধে নিহতদের শহীদ হিসেবে মহিমান্বিত করে এবং আত্মত্যাগ ও প্রতিরোধকে কেন্দ্র করে একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলে ইরান। এই বর্ণনায় শহীদী বাসনা শুধু ধর্মীয় ধারণা নয়, বরং রাষ্ট্রব্যবস্থার রাজনৈতিক বৈধতার অন্যতম স্তম্ভে পরিণত হয়।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে মুজতবা খামেনির নিয়োগ নতুন এক প্রতীকী তাৎপর্য আছে। তিনি শুধু সাবেক সর্বোচ্চ নেতার পুত্রই নন; রাষ্ট্রের নিজস্ব ন্যারেটিভে তিনি এমন এক উত্তরাধিকারী, যিনি আত্মত্যাগের সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত—যে ঐতিহ্যের ওপর তাঁর প্রয়াত পিতা জোর দিয়েছিলেন এবং যিনি শত্রুর হাতে নিজের পরিবারের সঙ্গে নিহত হয়েছেন, ঠিক যেমনটি হয়েছিল হোসাইনের ক্ষেত্রে। এই প্রতীকী সম্পর্ক ক্ষমতা সংহত করার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে এবং রাজনৈতিক ধারাবাহিকতাকে চলমান সংগ্রামের অংশ হিসেবে তুলে ধরতে পারে।

এই নিয়োগের দ্বৈত উদ্দেশ্য থাকতে পারে। ইরানের ভেতরে এটি দৃঢ়তা ও প্রতিরোধের ধারণাকে শক্তিশালী করবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এটি সংঘাত বা সমঝোতা—উভয় পথের জন্যই রাজনৈতিক আবরণ তৈরি করতে পারে। আয়রনি হলো, শক্ত অবস্থানের জন্য পরিচিত কোনো নেতা অনেক সময় প্রয়োজনীয় সমঝোতা করতেও সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকেন, কারণ তখন তাকে দুর্বলতার অভিযোগের মুখে পড়তে হয় না।

সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মুজতবা খামেনিকে অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেন এবং ইঙ্গিত দেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ইরানের নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা। কিন্তু ইরানের ভেতরে এ ধরনের মন্তব্য প্রায়ই উল্টো ফল দেয়। ইসলামী প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিদেশি হস্তক্ষেপের ব্যাপারে অত্যন্ত সংবেদনশীল। ওয়াশিংটন যখন প্রকাশ্যে কোনো ইরানি ব্যক্তিকে প্রত্যাখ্যান করে, তখন সেই প্রত্যাখ্যান অনেক সময় উল্টোভাবে তার অভ্যন্তরীণ অবস্থানকে শক্তিশালী করে। কারণ, তখন বিরোধিতাকে বিদেশি স্বার্থের সঙ্গে একাত্মতা হিসেবে তুলে ধরা যায়। ফলে ট্রাম্পের মন্তব্য মুজতবা খামেনির অবস্থান দুর্বল করার বদলে বরং আরও শক্তিশালী করতে পারে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সম্ভাব্য অন্যান্য প্রার্থীদের অধিকাংশের বিপরীতে মুজতবা খামেনি প্রভাব অর্জন করেছেন মূলত জনসম্মুখের আড়ালে থেকে। তিনি সংযত স্বভাবের মানুষ। সাধারণত তাকে ছবিতে দেখা যায় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতে। তিনি কখনো কোনো সরকারি পদে অধিষ্ঠিত হননি বা সে ধরনের পদ পাওয়ার চেষ্টা করেননি। জনসমক্ষে খুব কমই উপস্থিত হন এবং গণমাধ্যমের সঙ্গেও প্রায় কথা বলেন না।

মানুষের ক্ষমতার রাজনীতিতে এমন কিছু চরিত্র থাকে, যারা সামনে খুব কমই দেখা যায়, কিন্তু পর্দার আড়ালে সুতো টানার ক্ষমতা তাদের হাতেই থাকে। ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় মুজতবা খামেনি অনেক দিন ধরেই তেমন এক প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত। সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয় থেকেই তিনি কাজ করেছেন এবং ধীরে ধীরে নিজের পরিচয় গড়ে তুলেছেন একজন ‘গেটকিপার’ ও রাজনৈতিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে, যিনি নিজের পিতা ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির ঘনিষ্ঠ বলয়ে অবস্থান করেন। বিশ্লেষকেরা প্রায়ই তাঁর তুলনা করেন ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির ছেলে আহমদ খোমেনির সঙ্গে। ইসলামী প্রজাতন্ত্রের শুরুর বছরগুলোতে আহমদ খোমেনিও ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী এক মধ্যস্থতাকারী।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মুজতবা খামেনি তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে নিজের প্রভাব বিস্তার করেছেন। একটি হলো ধর্মীয় আলেম সমাজ বা ক্লেরিক্যাল প্রতিষ্ঠান, দ্বিতীয়টি নিরাপত্তা বাহিনী, আর তৃতীয়টি সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়কে ঘিরে থাকা রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক। নিরাপত্তা বাহিনীর ভেতরে তাঁর মিত্রদের মধ্যে রয়েছেন মোহাম্মদ রেজা নাকদি, যিনি একসময় বাসিজ মিলিশিয়ার কমান্ডার ছিলেন এবং হোসেইন তাইব, যিনি দীর্ঘদিন ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আইআরজিসির সাবেক কমান্ডার হোসেইন হামেদানিও মুজতবা খামেনির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। ইরান–ইরাক যুদ্ধের সময়কার প্রাথমিক সহযোগিতা থেকেই তাদের এই সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

আইআরজিসির সঙ্গে তার সম্পর্ক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই সম্পর্কের শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় ইরান–ইরাক যুদ্ধের সময়। সে সময় মুজতবা খামেনি হাবিব ইবনে মাজাহির ব্যাটালিয়নে দায়িত্ব পালন করেন। এটি ছিল বিপ্লবী নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত এক স্বেচ্ছাসেবী ইউনিট, যা পরে ইরানের নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হয়ে ওঠে। তার সেই সময়ের অনেক সহযোদ্ধা পরে আইআরজিসি ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর শীর্ষ পদে উঠে আসেন। যুদ্ধের সময় গড়ে ওঠা এই সম্পর্কগুলোই ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরে মুজতবার অবস্থানকে শক্ত ভিত্তি দেয়।

এত প্রভাব থাকা সত্ত্বেও মুজতবা খামেনিকে খুব কমই জনসমক্ষে দেখা যায়। তাঁর সাম্প্রতিক সময়ে বহুল প্রচারিত ছবিগুলোর একটি তোলা হয়েছিল ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। সে সময় হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরাল্লাহ হত্যাকাণ্ডের পর তিনি তেহরানে হিজবুল্লাহর কার্যালয়ে গিয়ে শোক প্রকাশ করেন। দীর্ঘ সময়ের নীরবতার পর এই উপস্থিতি অনেকের কাছে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে।

ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে কখনো কখনো মুজতবা খামেনির প্রভাব দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। পর্যবেক্ষকেরা প্রায়ই ইব্রাহিম রাইসির উত্থানকে এর উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। বহু বছর ধরে রাইসি ইরানের বিচারব্যবস্থায় খুব একটা আলোচিত ছিলেন না। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি চলে আসেন এবং শেষ পর্যন্ত অন্য প্রার্থীদের অযোগ্য ঘোষণার পর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এই উত্থান ছিল ইসলামী প্রজাতন্ত্রে উত্তরাধিকার প্রশ্নকে প্রভাবিত করার বৃহত্তর এক কৌশলের অংশ। তবে ২০২৪ সালের মে মাসে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় রাইসির আকস্মিক মৃত্যু সেই পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন এনে দেয় এবং নেতৃত্বের প্রশ্নকে আবার নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। প্রধান সম্ভাব্য উত্তরসূরি আর না থাকায় দৃষ্টি আবার ঘুরে যায় মুজতবা খামেনির দিকে, যিনি দীর্ঘদিন ধরে নেপথ্যে থেকেই কাজ করে গেছেন।

ইরানের ক্ষমতাসীন অভিজাতদের সঙ্গে যুক্ত অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক সম্পর্কিত অভিযোগগুলোও মুজতবা খামেনির রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে প্রভাবিত করেছে। পশ্চিমা গণমাধ্যমের বিভিন্ন অনুসন্ধানে পরোক্ষভাবে মুজতবা খামেনির নাম এমন কিছু আর্থিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়, যেগুলো নাকি আন্তর্জাতিকভাবে সম্পদ স্থানান্তরের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছিল। এসব প্রতিবেদনে যে ব্যক্তির নাম এসেছে, তাদের একজন হলেন ইরানি ব্যাংকার আলি আনসারি। তাঁর ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের মধ্যে ছিল আয়ানদেহ ব্যাংক এবং বিদেশে বড় বড় রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগ।

পরে আয়ানদেহ ব্যাংক ব্যাপক লোকসান ও বিতর্কিত ঋণ বিতরণের কারণে ধসে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে হস্তক্ষেপ করতে হয়। তবে মুজতবা খামেনি কিংবা আনসারি কেউই এই অভিযোগিত সম্পর্কের সত্যতা নিশ্চিত করেননি এবং বিষয়টি এখনো বিতর্কিত। তবু এসব প্রতিবেদন ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে সমর্থন করে এমন শক্তিশালী আর্থিক নেটওয়ার্কের ধারণাকে আরও জোরদার করেছে।

বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকারের প্রতীকী বিতর্কের তুলনায় মুজতবা খামেনির ধর্মীয় যোগ্যতার প্রশ্ন হয়তো কম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ইরানের সংবিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার জন্য শীর্ষ পর্যায়ের আলেম হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। ১৯৮৯ সাল থেকে একমাত্র শর্ত হলো, নেতাকে স্বতন্ত্রভাবে ফিকহভিত্তিক বা শরিয়াভিত্তিক আইনগত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হতে হবে।

তরুণ খামেনি কয়েক দশক ধরে কোম শহরের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছেন। তিনি উচ্চস্তরের ‘বাহ্স আল-খারিজ’ পাঠও পরিচালনা করেছেন, যা শিয়া ইসলামি আইনের শিক্ষায় সর্বোচ্চ স্তরের পাঠক্রম হিসেবে বিবেচিত। তবে এই পটভূমি তাঁকে বিস্তৃত ধর্মীয় স্বীকৃতি দেয় কি না, তা নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু আইনি দিক থেকে এই ধরনের নেতৃত্বে রূপান্তর ইতোমধ্যেই ব্যবস্থার ভেতরে সম্ভব।

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মুজতবা খামেনি জনদৃষ্টির বাইরে থেকেই নিজের প্রভাবের জাল বুনেছেন। জনসমর্থন অর্জনের চেষ্টা না করে তিনি বরং নেটওয়ার্ক ও জোট গঠনে মনোযোগ দিয়েছেন। নীরবে, আড়ালে থেকেই তিনি কাজ করে গেছেন। এখন, যখন ইরান এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের মুখে দাঁড়িয়ে, সেই নেপথ্যের মানুষটিই হঠাৎ করে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে এসে পড়েছেন।

কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ—চলমান যুদ্ধের আলোকে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল কীভাবে বিষয়টি বিবেচনা করবে? বছর দুয়েক আগে ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে জানিয়েছিল যে, মুজতবা খামেনি তাঁর বাবার চেয়েও বেশি হার্ডলাইনার বা কট্টর। মুজতবা খামেনির নিয়োগের পর ট্রাম্প নাকি জানিয়েছেন, তিনি এতে ‘খুশি’ নন।

অপরদিকে, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ গত বুধবারই সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যাকেই নেতা হিসেবে বেছে নিক না কেন, যদি সে ‘ইসরায়েলকে ধ্বংস’ করার পথ অনুসরণ করে, তাহলে তাঁকে হত্যার জন্য নিশ্চিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হবে। সুতরাং, ইসরায়েলি নেতাদের এই বক্তব্যকে যদি সরাসরি ধরে নেওয়া হয়, তাহলে তারা যেমন তাঁর বাবাকে খুঁজে বের করে আঘাত করার চেষ্টা করেছিল, তেমনভাবেই তাঁকেও লক্ষ্য করে তাড়া করবে। সুযোগ পেলেই হামলা চালানোর চেষ্টা করবে। আর যদি তারা প্রয়োজনীয় গোয়েন্দা তথ্য পেয়ে যায়, তাহলে সেই আঘাত হানতেও পিছপা হবে না।

এর বাইরে গিয়ে ইসরায়েলিরা আরেকটি বিষয়ও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করবে। তা হলো, এই পরিস্থিতি ইরানের নেতৃত্বের সামগ্রিক অবস্থার বিষয়ে কী ইঙ্গিত দেয়। মূলত ইরান সরকার এখন নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক ধরনের অস্তিত্বগত লড়াইয়ের মধ্যে রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে তারা স্পষ্টতই ধারাবাহিকতার প্রতীক হিসেবে একজনকে বেছে নিয়েছে। আর তিনি হলেন সাবেক সর্বোচ্চ নেতার ছেলে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মুজতবা হোসেইনি খামেনি যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁর বাবার চেয়েও কট্টর হয়ে থাকেন, তাহলে এই যুদ্ধের গতিপথ কেমন হবে? এমনটা হলে স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেওয়া যায় যে, ইরান যুদ্ধ বন্ধ করলে কেবল তা নিজ শর্তেই করবে। যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া শর্তে নয়। এটা অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে উঠে গতকাল রোববার আইআরজিসির এক কমান্ডারের বক্তব্য থেকে। তিনি জানান, ইরানের আরও ৬ মাস যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা আছে।

তবে চূড়ান্তভাবে মুজতবা হোসেইনি খামেনির আয়াতুল্লাহ নির্বাচিত হওয়া ইরানের সমাজে, রেজিমে এবং চলমান যুদ্ধে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে তা স্পষ্ট হওয়ার জন্য আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতেই হবে।

সূত্র : ফরেন পলিসি ও আল জাজিরা