আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সংঘাতের নবম দিনে প্রথমবারের মতো উপসাগরীয় দেশে পানি ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল। ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী পানযোগ্য পানি তৈরি ও সরবরাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ হামলার ঠিক এক দিন আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি একটি অভিযোগ করে বলেন, দক্ষিণ ইরানের কেশম দ্বীপে অবস্থিত একটি পানি শোধনাগারে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে এক পোস্টে আরাগচি লেখেন, (ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টে) হামলার ফলে ৩০টি গ্রামে পানি সরবরাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইরানের এ ধরনের অবকাঠামোতে হামলা চালানো একটি বিপজ্জনক পদক্ষেপ। এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। এই নজির ইরান নয়, তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
তবে বাহরাইনে হামলার বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি তেহরান।
এ ঘটনা উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তার দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। মরু অঞ্চলের এসব দেশ তাদের ব্যবহারের পানির চাহিদার বড় অংশের জন্য শোধনাগারগুলোর ওপর নির্ভরশীল।
ডিস্যালাইনেশন প্ল্যান্ট কী?:
ডিস্যালাইনেশন প্ল্যান্ট মূলত সমুদ্রের লবণাক্ত পানি থেকে লবণ ও দূষণ অপসারণ করে পানযোগ্য পানি তৈরি করে। এই প্রক্রিয়ায় সাধারণত দুটি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়— তাপ প্রয়োগ করে পানি বাষ্পে পরিণত করে পরে তরলে রূপান্তর এবং মেমব্রেন প্রযুক্তি, বিশেষ করে ‘রিভার্স অসমোসিস’, যা লবণ ও অন্যান্য উপাদান আলাদা করে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের বেশিরভাগ দেশ এই রিভার্স অসমোসিস প্রযুক্তি ব্যবহার করে।
মধ্যপ্রাচ্যে এর প্রভাব :
মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চল প্রাকৃতিকভাবে অত্যন্ত শুষ্ক। বৃষ্টিপাত কম এবং মিঠা পানির উৎস সীমিত থাকায় এই অঞ্চলের দেশগুলো পানির বড় অংশই সমুদ্রের পানি ডিস্যালাইনেশন করে নিতে হয়।
আরব সেন্টার ওয়াশিংটন ডিসির তথ্যমতে, বিশ্বে মোট ডিস্যালাইনেশন সক্ষমতার প্রায় ৬০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ বা জিসিসি সদস্য দেশগুলো। বিশ্বের মোট পরিশুদ্ধ সমুদ্রের পানির প্রায় ৪০ শতাংশ এখানেই উৎপাদিত হয়।
দেশভেদে পানির নির্ভরতার হারও অনেক বেশি। যেমন- কুয়েতে সুপেয় পানির প্রায় ৯০ শতাংশ, ওমানে ৮৬ শতাংশ, সৌদি আরবে প্রায় ৭০ শতাংশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রায় ৪২ শতাংশ পানি ডিস্যালাইনেশন প্ল্যান্টের ওপর নির্ভরশীল। এসব দেশে চার শতাশিক ডিস্যালাইনেশন প্ল্যান্ট রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছে, এসব স্থাপনায় হামলা হলে শুধু পানি সরবরাহই নয়, পুরো অর্থনীতি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এসব প্ল্যান্ট ক্ষতিগ্রস্ত হলে- শহরগুলোর পানির সরবরাহ দ্রুত কমে যেতে পারে, কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে চাপ তৈরি হতে পারে, সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়তে পারে।
অতীতে ১৯৯০-৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় ইরাক কুয়েতের বেশির ভাগ ডিস্যালাইনেশন স্থাপনা ধ্বংস করে দেয়, যার ফলে দেশটির পানি সরবরাহে বড় সংকট তৈরি হয়েছিল।
ছোট উপসাগরীয় দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বাহরাইন, কুয়েত ও কাতার। কারণ এসব দেশের বিকল্প পানি উৎস খুবই সীমিত এবং কৌশলগত পানির মজুতও তুলনামূলক কম। তবে বড় দেশগুলো কিছুটা প্রস্তুতি রেখেছে। যেমন সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রায় ৪৫ দিনের পানির মজুত ধরে রাখার পরিকল্পনা করেছে বলে জানা গেছে।
এর আগে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে ভারত ও ইউরোপে তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)। একই সঙ্গে এই গ্যাসের দাম একলাফে ৩০ শতাংশ বেড়েছে।
আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাতার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন স্থগিত করায় বিশ্ববাজারে সরবরাহ নিয়ে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে ভারতীয় কোম্পানিগুলো ইতিমধ্যেই শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিয়েছে।