রবিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৩ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৮ জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

লালদীঘি ময়দানে আজ জব্বারের বলীখেলা

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি : চট্টগ্রামের শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী আবদুল জব্বারের বলীখেলা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

শনিবার (২৫ এপ্রিল) লালদীঘি ময়দানে দেশের খ্যাতিমান বলীরা (কুস্তিগীর) শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে নামবেন। এ খেলায় অংশ নিতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন জেলা থেকে চট্টগ্রাম এসেছেন শতাধিক বলী।

এদিকে ১১৭তম এই আসরকে ঘিরে জমে উঠেছে তিন দিনের বৈশাখী মেলা। শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া বৈশাখী মেলাকে কেন্দ্র করে লালদীঘি মাঠ ও আশপাশ এলাকায় মানুষের ঢল নেমেছে। নগরজুড়ে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ।

বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী প্রতি বছর ১২ বৈশাখে অনুষ্ঠিত হওয়া এই বলীখেলা চট্টগ্রামের অন্যতম প্রাচীন ও জনপ্রিয় লোকজ ক্রীড়া আয়োজন। শত বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্য এখন শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি নগরবাসীর সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে।

এবার এসএসসি পরীক্ষার কারণে মেলা ও আয়োজনের সময়সূচিতে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যেন মেলা ভোরের মধ্যেই শেষ করা হয়। আয়োজকরা জানান, বিষয়টি মাথায় রেখেই সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে পরীক্ষার্থীদের কোনো ধরনের ভোগান্তি না হয়।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ১৯০৯ সালে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় যুবসমাজকে শারীরিকভাবে প্রস্তুত করতে মরহুম আবদুল জব্বার সওদাগর এ বলীখেলার সূচনা করেন। সময়ের পরিক্রমায় এটি চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান লোকজ উৎসবে পরিণত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রামের লালদীঘি মোড়কে ‘জব্বারের মোড়’ হিসেবে নামকরণের দাবি উঠেছে এবং ঐতিহ্যকে ধারণ করে এলাকাটিকে নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মেলার আয়োজক কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক শওকত আনোয়ার বাদল জানান, জব্বারের বলীখেলাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরতে তারা কাজ করে যাচ্ছেন। একইসঙ্গে মরহুম আবদুল জব্বার সওদাগরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান এবং চট্টগ্রামে একটি বলীখেলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার দাবি জানান তারা। এবারের বলীখেলায় অংশ নিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বলীরা চট্টগ্রামে এসে পৌঁছেছেন। কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নোয়াখালী, ফেনী, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, এমনকি উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকেও শক্তিশালী কুস্তিগীররা অংশ নিচ্ছেন। আয়োজক কমিটির তথ্য অনুযায়ী, এবার প্রায় ৮০ থেকে ১০০ বলী প্রতিযোগিতায় অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

স্থানীয় ভাষায় কুস্তিগীরদের ‘বলী’ বলা হয়, আর এই প্রতিযোগিতাকে বলা হয় ‘বলীখেলা’। এটি মূলত গ্রামীণ কুস্তির একটি ঐতিহ্যবাহী রূপ, যেখানে শক্তি, কৌশল ও সহনশীলতার সমন্বয়ে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। মাটির তৈরি বিশেষ বৃত্তাকার মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বীরা মুখোমুখি হন এবং নির্দিষ্ট নিয়মে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করার চেষ্টা করেন।

ঐতিহাসিকভাবে এই বলীখেলার সূচনা হয় ১৯০৯ সালে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর তরুণদের শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তাদের সংগঠিত করার উদ্দেশ্যে এই প্রতিযোগিতার প্রচলন করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি একটি জনপ্রিয় লোকজ উৎসবে পরিণত হয় এবং আজও সেই ঐতিহ্য বহন করে চলছে।

গত দুই আসরে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন কুমিল্লার বাঘা শরীফ কুস্তিগীর, যিনি ফাইনালে রাশেদ বলিকে পরাজিত করে শিরোপা জিতেছিলেন। ফলে তিনি টানা দুইবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। এবারের আসরেও শরীফ ও রাশেদ— দুই প্রতিদ্বন্দ্বীই অংশ নিচ্ছেন, যা দর্শকদের আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এবারের ফাইনালেও এই দুই বলীর মধ্যে লড়াই জমে উঠতে পারে।

মেলা ঘিরে লালদীঘি মাঠজুড়ে বসেছে বৈশাখী পসরা। রয়েছে মাটির তৈরি নানা জিনিস, বাঁশ ও কাঠের হস্তশিল্প, লোকজ অলঙ্কার, খেলনা, গৃহস্থালি সামগ্রীসহ বিভিন্ন দোকান। পাশাপাশি রয়েছে দেশীয় খাবারের স্টল। শিশুদের জন্য নাগরদোলা, বিভিন্ন রাইড ও বিনোদনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

আয়োজকরা জানান, বলীখেলা সফলভাবে আয়োজন করতে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। মাঠ প্রস্তুত করা হয়েছে, বলীদের থাকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং জরুরি চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এছাড়া দর্শকদের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে স্বেচ্ছাসেবক দল কাজ করছে।

নিরাপত্তা জোরদারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকেও নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। লালদীঘি মাঠ ও আশপাশ এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে ওয়াচ টাওয়ার। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে বসানো হয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা।

কোতোয়ালি থানার ওসি আফতাব উদ্দিন বলেন, বলীখেলা ও মেলাকে কেন্দ্র করে পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ইউনিফর্মের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন।দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছি। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

১১৭তম জব্বারের বলীখেলা ঘিরে চট্টগ্রামে এখন উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। আয়োজকরা আশা করছেন, দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য বজায় রেখে এবারের আয়োজনও শান্তিপূর্ণ ও সফলভাবে সম্পন্ন হবে এবং দর্শকদের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

প্রসঙ্গত, স্থানীয় বদরপতি এলাকার আবদুল জব্বার সওদাগর ১৯০৯ সালে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে এ অঞ্চলের যুবকদের সংগঠিত করতে লালদীঘি মাঠে কুস্তিখেলার প্রচলন করেছিলেন। সে কুস্তি কালক্রমে পরিচিত হয়ে উঠেছে ‘বলীখেলা’ নামে। প্রতিবছর ১২ বৈশাখ লালদীঘি মাঠে অনুষ্ঠিত হয় এ বলীখেলা।