রবিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৩ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৮ জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

ক্ষমতাসীনদের ছাত্রসংগঠন সবসময়ই বোঝা

ফাইজ আহমদ তাইয়েব :

ঐতিহাসিকভাবে, বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের জন্য ছাত্র রাজনীতি খারাপ ছাড়া কোনো ভালো কিছু কখনও বয়ে আনতে পারেনি। সরকারের জন্য কেন যেন ছাত্র রাজনীতি শুধুমাত্র বোঝাই হয়ে ওঠে দিনশেষে। ছাত্র রাজনীতি সরকারকে ক্ষমতা রাখতে খুব সাহায্য করে এর কোনও প্রমাণ বাংলাদেশে নাই। বরং সরকারকে অজনপ্রিয় করতে ভূমিকা রাখে। তথাপি বিশ্ববিদ্যালয় গুলো হার্ড-পাওয়ার পকেটগুলোর মধ্যে অন্যতম বলে, সকল ক্ষমতাসীন দল ছাত্র রাজনীতির এই বোঝাটাকে বহন করে, সচেতনভাবেই। বিপরীতে, বিরোধী দলের জন্য ছাত্র রাজনীতি পূর্ণ যৌবনা ফসলি জমি। ফলে অন্যকোনো ভাবে সুবিধা করতে না পারলেও বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক বিরোধী রাজনীতি, বিরোধীদলকে বেশ এগিয়ে রাখে। কেননা ক্যাম্পাসে অস্থিরতা, অস্থিতিশীলতা, বিশৃঙ্খলা মাত্রই সরকারের জনপ্রিয়তার পারদ নেমে আসা।

আমরা বাংলাদেশের প্রতিটি সরকার পতনের সাথে, প্রায় প্রতিটি জাতীয় মুক্তির আন্দোলনের সাথে, প্রতিবার স্বৈরশাসক কিংবা ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থা পতনের সাথে বিরোধী ছাত্র রাজনীতির সুস্পষ্ট সাফল্যের সম্পর্ক দেখেছি।

আমার বিশ্ববিদ্যালয়কালীন সময়ে ছাত্রদলের দুই গ্রুপ টেন্ডারবাজদের গোলাগুলিতে আমাদের সহপাঠী সনি মারা গিয়েছেন। বেগম খালেদা জিয়াকে ছাত্রদলের কর্মকাণ্ড স্থগিত করতে হয়েছিল। শেখ হাসিনার ছাত্রলীগ খুন খারাবি শুধু নয়, ব্যাংক লুট করা, ব্যাংকের মালিক বনে যাওয়া পর্যন্ত সব ধরনের অপরাধের সাথে জড়িয়ে, সবশেষে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সাধারণ শিক্ষার্থী বিশেষভাবে নির্দলীয় ছাত্রীদের গায়ে হাত তুলে হাসিনার বিদায়কে ত্বরান্বিত করেছে।

ফলে, হার্ড পাওয়ার পকেটের নিয়ন্ত্রণ বনাম ছাত্র সংগঠনের অপরাধ প্রবণতা- এই উভয় সংকট মাথায় রেখে, সরকারি দলকে এটা মাথায় রেখে লেজুড়ভিত্তিক রাজনৈতিক কাঠামোতে বেটার ফাংশন করতে গেলে, ছাত্র রাজনীতিকে অপরাজনীতি থেকে বের করে আনার একটি দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। একটা সম্ভাব্য উপায় হচ্ছে, এদেরকে প্রোডাক্টিভ কাজে ব্যস্ত রাখা। দক্ষতা তৈরির ট্রেনিং কোর্সে ইনভলভ করে রাখা, রিসার্চ বা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সমীক্ষা, সোশ্যাল অ্যাওয়ারনেস, বনায়ন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা, পরিবেশ সুরক্ষা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং গ্রিন ট্রান্সফর্মেশন সহ বিভিন্ন উন্নয়ন সংক্রান্ত জরিপ ইত্যাদিতে ব্যস্ত রাখা যাতে নেতাকর্মীদের কর্মদক্ষতা ও বাস্তব জ্ঞান তৈরি হয়। যেমন, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছাত্রদের অন্তত একটি করে গাছ লাগাতে এবং একজন করে নিরক্ষরকে স্বাক্ষর করতে নিয়োজিত করেছিলেন।

শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে জাতীয় নীতি ও রাজনীতি নিয়ে ডিবেটিং ক্লাবে বিতর্ক করবেন, বিভিন্ন ক্লাব করবেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও পত্রিকায় লিখবেন, ব্লগ করবেন, জাতীয় ইস্যুতে সামাজিক সংগঠনের ব্যানারে প্রতিবাদ করবেন। দলীয় রাজনীতি করতে চাইলে দলের অফিসে গিয়ে পলিসি স্টাডি করবেন। ক্যাম্পাসে রাজনীতির নামে সন্ত্রাস, ছাত্রীদের হেনস্থা করা, চাঁদাবাজি, ফাউ খাওয়া এবং আবরারের মতো অন্যদের পিটিয়ে মারার সুযোগ দেওয়ার যৌক্তিকতা নেই।

মেধাবীরা যদি দেশের পলিসি ও সুশাসন নিয়ে কাজ না করে, শুধু করপোরেট ও বিদেশি কোম্পানির দক্ষ চাকুরে হতে থাকেন, তাহলে দেশটা সেই স্বল্প শিক্ষিত, অযোগ্য, সন্ত্রাসীরাই শাসন করবে। রাজনীতিতে মেধা-ভিত্তিক জনবল যুক্ত করার একটা স্থায়ী পথ নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে।

এটা ঠিক যে, বিরাজনৈতিকীকরণ থামাতে সুস্থ ধারার ছাত্ররাজনীতির দরকার আছে, তবে লেজুড়বৃত্তিক অপরাজনীতির কোনো দরকার আর নাই। যেখানে গণরুম ও পেটানোর সংস্কৃতি থাকবে না, কেউ মিছিলে যেতে বাধ্য হবেন না। তবে দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো। এরচেয়ে ক্যাম্পাসে লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির লাগাম টেনে, আগ্রহী শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের বাইরে এসে রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে, দলীয় পলিসি ফোরামে, সামাজিক সংগঠনে যুক্ত হয়ে ছাত্ররাজনীতি করতে পারেন। ছাত্ররাজনীতিতে তাঁরা যদি পলিসি স্টাডি না করেন, দেশের সমস্যা নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক না করেন, সমাজ দর্শন, বৈশ্বিক জ্ঞান, বিশ্বব্যবস্থার ওপর চর্চা না করেন, তাহলে বর্তমান মডেলের লাঠিয়াল ছাত্ররাজনীতির কোনো প্রয়োজন নেই। বর্তমান যুগে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে ক্যাম্পাস-সংশ্লিষ্টতার একমুখী কোনো সম্পর্ক নেই। ক্যাম্পাসের দাবিদাওয়া-ভিত্তিক আন্দোলন করতে দলীয় লেজুড়বৃত্তিক সংশ্লিষ্টতার দরকার পড়ে না।

মোটকথা, আপনি হাজার হাজার কর্মীকে যেহেতু নগদ টাকা দিয়ে প্রতিদিন পালতে পারবেন না এবং দেওয়া উচিতও না, তাই তাদের কাজের মধ্যে ব্যস্ত রাখতে হবে। অন্যথায় তারা অকাজই করবে।

সমস্যা হয়ে গেছে আমাদের শিক্ষা প্রশাসন। তারা ২০ বছরের পুরোনো নকল নিয়ে পড়ে আছে। কিন্তু শিক্ষাঙ্গণের শিক্ষাদানের পরিবেশ, উন্নত স্কুল গড়া, অডিও ভিজুয়াল ক্লাস ও কারিকুলাম, শিক্ষাদান পদ্ধতির আধুনিকায়ন এবং কারিগরি প্রযুক্তি সম্পন্ন শিক্ষাদান পদ্ধতি নিশ্চিতকরণ; উন্নত শিক্ষক, মানসম্পন্ন শিক্ষক ট্রেনিং, শিক্ষকদের যাতায়াত, আবাসন এবং বেতন কেন্দ্রিক সমস্যা সমাধান, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ, শিক্ষা উপবৃত্তির সঠিক ও পরিমাণগত বিতরণ, শিক্ষার সাথে দক্ষতা তৈরির সম্পর্ক আনয়ন, শিক্ষা গবেষণার পরিবেশ এবং বরাদ্দ বাড়ানো, শিক্ষা গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের যাপিত জীবনের সমস্যা সহ বাংলাদেশের শিল্পের নানাবিধ সমস্যা সমাধান করা এবং সর্বোপরি কারিকুলামে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা রেডিনেস তৈরি করা- ইত্যাদি নিয়ে আমরা শিক্ষা প্রশাসন কিংবা শিক্ষামন্ত্রীকে ভাবতে দেখছি না। আমরা দেখছি প্রায় ২০ বছর আগের পুরোনো নকল সমস্যা নিয়েই মন্ত্রী সাহেব অতি আগ্রহী। নকল নিয়ন্ত্রণ করার কাজটা ছিল একজন শিক্ষকের, শিক্ষকের একটা রুটিন কাজকে যখন মন্ত্রী তার নিজের কাজ বানিয়ে ফেলেন, তখন আমাদেরকে বুঝতে হয়, অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজে মন্ত্রী অনুপস্থিত।

বর্তমান যুগে, প্রাথমিকের (ক্লাস সিক্স বা এইটের পরে) পরে সব শিক্ষার্থীর জন্য একই সিলেবাস বেমানান। কারণ সবার মেধা বিকাশের মাত্রা একই নয়। ফলে নকল প্রতিরোধের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকে ও শিখন পদ্ধতিকে আনন্দময় করা। এবং পরীক্ষা পদ্ধতিকে এমনভাবে সাজানো যাতে নকল করার ঝোঁক এবং করতে আরার সুযোগ দুটাই উঠে যায়।

ফলে সরকারি ছাত্র রাজনীতির নেতাকর্মীরা জাতীয় অ্যাজেন্ডায় প্রোডাক্টিভ কোনো এলিমেন্ট পাচ্ছে না, যা নিয়ে আলোচনা ও কর্ম করে তারা ছাত্র রাজনীতির ভরকেন্দ্রকে আবর্তন করবে। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণমূলক ছাত্র রাজনীতির জন্য, তাদেরকে হল দখলের রাজনীতিতে ফিরতে বাধ্য করছে কিছু না কিছু নেতা। কিংবা আয়হীন ছাত্রনেতাদের আয় জোগানোর জন্য চাঁদাবাজির দিকে ধাবিত করছে কর্মীদের।

এই যে সরকারি দলকে অজনপ্রিয় করার একটা কাঠামোগত সংস্কৃতি সরকারি ছাত্র রাজনীতি দিয়ে রেখেছে, এবং একই সাথে বিরোধী দলের রাজনীতির ছাত্র রাজনীতির ক্রমাগত সাফল্যকেও লাগাম টানার অনুভব,- এই দুইয়ের মধ্যে ট্রেইড অফ করতে হবে বর্তমান সরকারকে।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে নামের তুলনায় ছাত্রদল বেশ খারাপ ফল করেছে। এর অন্যতম একটি কারণ, বিগত সময়ে সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা যে-সব সমস্যায় ভুগছে, গণ রুমের সংস্কৃতি, মানহীন খাবার ও পানি, মশা ও রোগ, ভর্তি সংকট, শিক্ষক সংকট, আবাসন সংকট, মানসম্পন্ন চাকুরির অনিশ্চয়তা, বেকারত্ব ও কোটা কোটা সমস্যা কিংবা শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়নের যে চাহিদা- সেটা নিয়ে ছাত্রদলকে আমরা খুব বেশি কথা বলতে দেখিনি। বরং তারা প্রত্যাখ্যাত হওয়া অ্যাজেন্ডা (৭১ ও রাজাকার, প্রশ্ন ইত্যাদি)কে ছাত্ররাজনীতির ভরকেন্দ্র করতে গিয়ে বাজে ফল করেছে। এসব কারণে আজকের ছাত্রদলের উপরে একটি ঐতিহাসিক বার্ডেন এসে পৌঁছেছে।

একদিকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনে জায়গা করে নেওয়া, অন্যদিকে শিক্ষার মান এবং ক্যারিয়ারের জন্য শিক্ষা দক্ষতা তৈরি করার বিষয়ে জাতীয় নেতৃত্বের উপরে চাপ দেওয়া, দেশের কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং মানসম্পন্ন কাজের পরিবেশে জোর দেওয়া অর্থাৎ শিক্ষাজীবন শেষে অনিশ্চিত ক্যারিয়ারের দুশ্চিন্তা থেকে শিক্ষার্থীদের বের করে আনা – এমন ডেলিভারি ছাত্রদল ক্রমাগত দিতে না পারলে ছাত্রদলে নিউ রিক্রুটমেন্ট কমে আসবে। এটা ছাত্রলীগের ক্ষেত্রে প্রমাণিত হয়েছে।

একটি সরকারি রাজনৈতিক দলের এমন কোনো অ্যাজেন্ডা নিয়ে ব্যস্ত থাকার চলে না, যেই অ্যাজেন্ডা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোনো আবেদন রাখে না। ফলে সুপ্ত কিংবা গুপ্ত যেই রাজনীতির মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের বিদায় ত্বরান্বিত হয়েছে, তাকে সামনে এনে আজকের ছাত্র রাজনীতি আগাবে না।

ছাত্র রাজনীতিতে ছাত্রদলের ভালো করার একমাত্র উপায় শিক্ষার্থীদের চাওয়া-পাওয়াকে নিজেদের মুখের ভাষায় রূপান্তর করা। ছাত্র রাজনীতিতে ছাত্রদল তখনই ভালো করবে, যখন সংগঠনটি শিক্ষাঙ্গণে সংস্কারের চেনা মুখ বা নোউন ফেইস হয়ে ওঠবে।

অন্যথায় সাফল্যের পাল্লা বিরোধীদের দিকেই ঝুঁকবে, কেননা শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা যে কোনো অনিশ্চয়তা ও বিশৃঙ্খলার জন্য দিনশেষে সরকারকেই দায়ী করে।