হাফিজ উদ্দিন:
প্রতিটি শ্বাসের সঙ্গে আমরা যা গ্রহণ করি, তা কতটা বিশুদ্ধ? এই প্রশ্নের উত্তর দক্ষিণ এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের জন্য ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। বায়ু দূষণ এখন আর শুধু পরিবেশবিজ্ঞানীদের গবেষণাপত্রের বিষয় নয়—এটি প্রতিদিনের বাস্তবতা, প্রতিটি পরিবারের স্বাস্থ্য-সংকট এবং অগণিত অকালমৃত্যুর নীরব কারণ।
রোববার সকাল ৯টার পর বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী বিশ্বখ্যাত সংস্থা এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সের (আইকিউএয়ার) সর্বশেষ সূচক প্রকাশিত হয়েছে। সেই তথ্য অনুযায়ী, বায়ুমান স্কোর ২৩১ নিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ভারতের রাজধানী দিল্লি। দ্বিতীয় স্থানে নেপালের কাঠমান্ডু এবং তৃতীয় স্থানে চীনের চেংদু। আর বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা এদিন ৯৪ স্কোর নিয়ে ১৭ নম্বর অবস্থানে রয়েছে—যা গতকাল শনিবারের তুলনায় সামান্য উন্নতি।
এই সংখ্যাগুলো নিছক পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি স্কোরের পেছনে আছে লক্ষ লক্ষ মানুষের ফুসফুস, শিশুর শ্বাসনালী, বৃদ্ধের হৃদপিণ্ড এবং অসুস্থ মায়েদের দীর্ঘশ্বাস। বায়ুদূষণের এই বৈশ্বিক চিত্র বোঝার জন্য প্রয়োজন সূচকের মানদণ্ড, শহরগুলোর পরিস্থিতি এবং আমাদের ভবিষ্যৎ পথ সম্পর্কে একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি।
বায়ুমান সূচক কীভাবে পড়তে হয়?
আইকিউএয়ার যে স্কোর প্রকাশ করে, সেটি একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানদণ্ড যা বাতাসে ক্ষতিকর কণা ও গ্যাসের পরিমাণ পরিমাপ করে। এর মধ্যে পিএম ২.৫ এবং পিএম ১০ (অত্যন্ত সূক্ষ্ম ধূলিকণা), নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড, ওজোন, সালফার ডাই-অক্সাইড এবং কার্বন মনোক্সাইড পরিমাপ করা হয়।
স্কোর শূন্য থেকে ৫০-এর মধ্যে থাকলে বায়ুর মান ভালো বলে বিবেচিত হয়—এই পরিবেশে বাইরে হাঁটাচলা ও ব্যায়াম নিরাপদ। ৫১ থেকে ১০০ স্কোর হলে বায়ুর মান মাঝারি বা সহনীয়। এই পর্যায়ে সুস্থ মানুষের বড় ধরনের সমস্যা না হলেও অত্যন্ত সংবেদনশীল ব্যক্তিদের দীর্ঘ সময় বাইরে থাকা ঠিক নয়।
১০১ থেকে ১৫০ স্কোরকে বলা হয় সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর। শিশু, বৃদ্ধ, হাঁপানি বা ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত মানুষদের জন্য এই বাতাস ক্ষতিকর। ১৫১ থেকে ২০০ পর্যন্ত সাধারণভাবে অস্বাস্থ্যকর—সবার জন্যই বাইরে বেশিক্ষণ থাকা ক্ষতিকর হয়ে পড়ে। ২০১ থেকে ৩০০ স্কোর মানে বায়ু খুবই অস্বাস্থ্যকর, যেখানে সুস্থ মানুষও শ্বাসকষ্ট অনুভব করতে পারেন। আর ৩০১-এর বেশি স্কোর দুর্যোগপূর্ণ—এই বাতাসে স্বল্প সময়ের সংস্পর্শেও মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়।
দিল্লি: বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত রাজধানীর গল্প
স্কোর ২৩১—এই সংখ্যাটি দিল্লির বায়ুকে “খুবই অস্বাস্থ্যকর” বিভাগে রাখে। এর অর্থ হলো দিল্লির প্রতিটি বাসিন্দা প্রতিদিন যে বাতাস শ্বাস নিচ্ছেন, তা তাদের ফুসফুসের গভীরে ক্ষতিকর কণা পাঠাচ্ছে। শিশুরা স্কুলে যাচ্ছে এই বিষাক্ত বাতাসে, বৃদ্ধরা সকালে বেড়াতে বের হচ্ছেন, শ্রমিকরা রাস্তায় কাজ করছেন—সবাই একই ঝুঁকির মুখে।
দিল্লির এই দূষণের পেছনে আছে বহু স্তরে সমস্যা। প্রায় দুই কোটির বেশি মানুষের এই মহানগরে গাড়ির সংখ্যা বিশ্বের যেকোনো শহরের তুলনায় অনেক বেশি। প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ পেট্রোল-ডিজেলচালিত যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া বায়ুকে বিষময় করে তুলছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয় নির্মাণকাজের ধূলিকণা, শিল্পকারখানার নির্গমন, বর্জ্য পোড়ানো এবং আশপাশের কৃষিজমিতে ফসলের গোড়া পোড়ানোর ধোঁয়া।
ভৌগোলিক অবস্থানও দিল্লির বায়ুদূষণকে আরও জটিল করে তোলে। তিন দিকে পাহাড়ঘেরা এই শহরে বাতাসের স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, ফলে দূষিত বাতাস সহজে ছড়িয়ে পড়তে পারে না—এটি শহরের উপরেই আটকে থাকে। শীতকালে এই সমস্যা আরও ঘনীভূত হয়, যখন তাপমাত্রা কম থাকায় দূষিত কণাগুলো মাটির কাছাকাছি স্তরে জমে থাকে।
এর স্বাস্থ্যগত পরিণতি ভয়াবহ। দিল্লিতে শ্বাসতন্ত্রের রোগ, হৃদরোগ এবং ফুসফুসের ক্যান্সারের হার অন্য ভারতীয় শহরগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। শিশুদের ফুসফুসের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, গর্ভবতী মায়েদের অকালপ্রসবের হার বাড়ছে এবং গড় আয়ু কমছে।
কাঠমান্ডু ও চেংদু: দুটি ভিন্ন বাস্তবতা
১৬২ স্কোর নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা কাঠমান্ডুর পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। পাহাড়ঘেরা এই শহরে প্রাকৃতিকভাবেই বায়ু চলাচল কম। নেপালের দ্রুত নগরায়ন, পুরনো যানবাহনের ধোঁয়া, ইটভাটার নির্গমন এবং রাস্তার ধূলিকণা মিলিয়ে কাঠমান্ডুর বাতাস এখন “অস্বাস্থ্যকর” পর্যায়ে পৌঁছেছে। পর্যটন-নির্ভর এই শহরের জন্য এই দূষণ শুধু স্বাস্থ্য-সংকট নয়, অর্থনৈতিক হুমকিও বটে।
চেংদু চীনের একটি প্রধান শিল্পশহর। সিচুয়ান প্রদেশের এই শহরে শিল্পকারখানার ঘনত্ব বেশি এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বায়ু চলাচলে বাধা থাকে। চীন সরকার বায়ুদূষণ কমাতে গত দশ বছরে কঠোর পদক্ষেপ নিলেও শিল্পশহরগুলোতে পরিস্থিতির উন্নতি ধীর গতিতে হচ্ছে।
ঢাকার উন্নতি: সংখ্যার পেছনের চিত্র
গতকাল শনিবার ঢাকার বায়ুমান স্কোর ছিল ৯৬, আর রোববার তা ৯৪-এ নেমে এসেছে। পাশাপাশি তালিকায় অবস্থান ১৩ থেকে ১৭-তে নেমেছে, যার অর্থ অন্য শহরগুলোর তুলনায় ঢাকার বায়ু তুলনামূলকভাবে ভালো হয়েছে। ৯৪ স্কোর মানে ঢাকার বাতাস এই মুহূর্তে “সহনীয়” পর্যায়ে আছে—যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।
তবে এই উন্নতিকে নিয়ে অতিরিক্ত আশাবাদী হওয়ার সুযোগ কম। ৯৪ স্কোর এখনো “ভালো” মাত্রার (০-৫০) অনেক উপরে। এর মানে ঢাকার বাতাস মোটামুটি নিরাপদ হলেও শিশু, বৃদ্ধ এবং ফুসফুসের সমস্যায় আক্রান্তদের জন্য সতর্কতা এখনো প্রয়োজন। একটি শহরের বায়ুমান একদিনে ওঠানামা করে—গতকাল ভালো মানে আগামীকালও ভালো থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
ঢাকার বায়ুদূষণের কারণগুলো সুপরিচিত। ইটভাটা, যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধূলিকণা, শিল্পকারখানার নির্গমন এবং বর্জ্য পোড়ানো—এই পাঁচটি উৎস থেকেই ঢাকার বেশিরভাগ বায়ুদূষণ হয়। শুষ্ক মৌসুমে যখন বৃষ্টি নেই এবং বাতাসের গতি কম, তখন দূষণের মাত্রা লাফিয়ে বাড়ে। আজকের তুলনামূলক ভালো স্কোর আবহাওয়ার অনুকূল পরিস্থিতির কারণেও হতে পারে।
বায়ুদূষণ ও স্বাস্থ্য: নীরব মহামারি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৭০ লক্ষ মানুষ বায়ুদূষণের কারণে মারা যান। দক্ষিণ এশিয়া এই মৃত্যুর সবচেয়ে বড় অংশীদার। ফুসফুসের ক্যান্সার, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ, হৃদরোগ এবং স্ট্রোক—এই চারটি রোগের একটি বড় অংশের পেছনে দায়ী বায়ুদূষণ।
সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো পিএম ২.৫ কণা—এতটাই সূক্ষ্ম যে এটি নাক ও গলার প্রাকৃতিক ফিল্টার পার হয়ে সরাসরি ফুসফুসের গভীরে পৌঁছে যায়, এমনকি রক্তেও মিশে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এই কণা ফুসফুসের কোষ ধ্বংস করে, রক্তনালিকে শক্ত করে এবং মস্তিষ্কের উপরেও বিরূপ প্রভাব ফেলে।
শিশুরা বায়ুদূষণের সবচেয়ে বড় শিকার। তাদের ফুসফুস এখনো বিকশিত হচ্ছে, শ্বাসের হার বেশি এবং শরীরের ওজনের অনুপাতে বেশি বায়ু গ্রহণ করে। দূষিত পরিবেশে বড় হওয়া শিশুদের ফুসফুস কখনো পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হয় না—এই ক্ষতি সারা জীবন বহন করতে হয়।
সমাধানের পথ: কী করা যায়?
বায়ুদূষণ কমানো সম্ভব—এটি প্রমাণিত। চীনের বেইজিং একসময় দিল্লির মতোই দূষিত ছিল। কিন্তু কঠোর সরকারি নীতি, কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করা, পুরনো যানবাহন নিষিদ্ধ করা এবং ব্যাপক বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে বেইজিং তার বায়ুমানের উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটিয়েছে। এটি একটি অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ।
ঢাকার জন্য সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ হলো ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ। বাংলাদেশে হাজার হাজার ইটভাটা এখনো পুরনো প্রযুক্তিতে চলছে এবং এগুলো বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান উৎস। পরিবেশবান্ধব ব্লক তৈরির প্রযুক্তিতে রূপান্তর এবং পোড়া ইটের পরিবর্তে বিকল্প নির্মাণ সামগ্রীর ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।
যানবাহন খাতে বৈদ্যুতিক বাস ও রিকশার প্রসার এবং পুরনো দুই-স্ট্রোক ইঞ্জিনের যানবাহন নিষিদ্ধ করা দরকার। গণপরিবহন ব্যবস্থা উন্নত করলে মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমাবে। নির্মাণস্থলে ধূলিকণা নিয়ন্ত্রণের জন্য আইনের কঠোর প্রয়োগ, নিয়মিত সড়ক পরিষ্কার এবং শহরে গাছপালা বাড়ানো—এই পদক্ষেপগুলো মিলিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
প্রতিটি শ্বাস একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত
বায়ুদূষণ কোনো অনিবার্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়—এটি মানুষের তৈরি সমস্যা এবং মানুষই এর সমাধান করতে পারে। দিল্লির ২৩১ স্কোর বা ঢাকার ৯৪ স্কোর—এগুলো শুধু সংখ্যা নয়, এগুলো নীতিনির্ধারকদের ব্যর্থতা ও সাফল্যের প্রতিফলন।
সাধারণ নাগরিক হিসেবেও আমাদের ভূমিকা আছে। অপ্রয়োজনীয় গাড়ি চালানো কমানো, বর্জ্য না পোড়ানো, গাছ লাগানো এবং পরিবেশ রক্ষায় সরকারের উপর চাপ তৈরি করা—এই ছোট ছোট পদক্ষেপই বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কারণ শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই একই বাতাসে শ্বাস নিই।
আজকের ঢাকার তুলনামূলক ভালো স্কোর একটি মুহূর্তের স্বস্তি হতে পারে, কিন্তু এটি উদযাপনের বিষয় নয়—এটি আরও ভালো করার অনুপ্রেরণা। আর দিল্লির ভয়াবহ পরিসংখ্যান একটি সতর্কবার্তা: আমরা যদি এখনই না সচেতন হই, তাহলে ঢাকার ভবিষ্যতও হয়তো দিল্লির আজকের মতো হতে পারে।