বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৭ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১২ জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪ বিমান কেনার চুক্তি সম্পন্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক : বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ১৪টি উড়োজাহাজ কিনতে যুক্তরাষ্ট্রের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় রাজধানীর একটি হোটেলে এ চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠিত হয়।

বিমানের পক্ষে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও কাইজার সোহেল আহমেদ এবং বোয়িংয়ের পক্ষে প্রতিষ্ঠানটির ভাইস প্রেসিডেন্ট পল রিঘি চুক্তিতে সই করেন।

উড়োজাহাজগুলোর বাজার মূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা।

অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ূন কবির, মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন, বিমানের বোর্ড চেয়ারম্যান রুমি এ হোসেইন, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কূটনীতিক ও অ্যাভিয়েশন খাতের নির্বাহীরা উপস্থিত ছিলেন।

চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী মিল্লাত বলেছেন, এটা শুধু চুক্তি নয় এটা যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের সম্পর্কের নতুন সেতু বন্ধন। এই চুক্তি বিশ্বকে বাংলাদেশের আরো কাছে নিয়ে আসবে।

চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে পল রিঘি বলেন, এ চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের বিমান চলাচলের যাত্রাপথে একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত তৈরি হলো। এর ফলে বিমান বাংলাদেশ বিশ্বের সেই অল্প কয়েকটি এয়ারলাইন্সের মধ্যে অন্যতম হয়ে উঠলো যারা ৭৮৭ ড্রিমলাইনারের সম্পূর্ণ সিরিজ- ৭৮৭-৮, -৯ এবং -১০—পরিচালনা করবে।

৭৮৭-১০ মডেলটি মধ্যপ্রাচ্যসহ উচ্চ চাহিদার রুটগুলোতে অতুলনীয় দক্ষতা ও বর্ধিত ধারণক্ষমতা নিয়ে আসবে, অন্যদিকে ৭৮৭-৯ মডেলটি ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার দূরপাল্লার রুটগুলোতে পরিষেবা দেবে। এই ক্রয় আদেশ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সর্বশেষ প্রজন্মের ৭৩৭ সিরিজের সাথে প্রথম সংযোগ স্থাপন করলো।

সম্মিলিতভাবে, ৭৮৭ এবং ৭৩৭ সিরিজের বিমানগুলো তাদের প্রতিস্থাপিত বিমানের তুলনায় ২০% পর্যন্ত বেশি জ্বালানি সাশ্রয়ী। এছাড়াও, উন্নত কেবিন ফিচার, অধিক আরাম এবং মসৃণ ভ্রমণের মাধ্যমে এগুলো যাত্রীদের অভিজ্ঞতাকে আরও উন্নত করবে। সার্বিকভাবে, এই যুগান্তকারী চুক্তিটি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, ফ্লিট আধুনিকীকরণ এবং যাত্রীদের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা উন্নত করার কৌশলকে সমর্থন করে। এটি বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুত বর্ধনশীল বিমান চলাচল বাজারে একটি উদীয়মান হাব হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করবে।

প্রস্তাবিত এ চুক্তির আওতায় বিমান মোট ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ কিনবে। এর মধ্যে রয়েছে ৮টি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, ২টি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার, ৪টি বোয়িং ৭৩৭-৮ ম্যাক্স জেট।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ক্রমবর্ধমান যাত্রী চাহিদা মেটাতে বহর আধুনিকায়নে ও দীর্ঘ রুটে ফ্লাইট পরিচালনার সক্ষমতা বাড়াতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ড্রিমলাইনারগুলো ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার রুটে এবং ৭৩৭ ম্যাক্স উড়োজাহাজগুলো আঞ্চলিক ও স্বল্প দূরত্বের রুটে ব্যবহার করা হবে।

বিমানের এই বড় আকারের ক্রয় আদেশ নিয়ে গত ৩ বছর ধরে বোয়িং ও ইউরোপভিত্তিক নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছিল।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ১০টি এয়ারবাস কেনার একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের গণঅভুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ব্যবধান কমানোর কৌশলগত চাপে অন্তর্বর্তী সরকার বোয়িংয়ের পক্ষেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে ১৪টি উড়োজাহাজের মূল্য ১০ থেকে ২০ বছর মেয়াদি দীর্ঘকালীন কিস্তিতে পরিশোধ করা হবে। অর্থাৎ বছরে দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে হতে পারে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক কমানোর বিষয়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

এর আগে বিমান চলাচল প্রতিমন্ত্রী রাশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেছেন, বিমানকে একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে ৩০ এপ্রিলের মধ্যে বোয়িংয়ের সঙ্গে এই চুক্তি সই করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার।

বর্তমানে বিমানের বহরে রয়েছে মাত্র ১৯টি উড়োজাহাজ। গত বছর লিজের মেয়াদ শেষ হওয়ায় দুটি উড়োজাহাজ ফেরত দেওয়ার পর বহরটি আরো সংকুচিত হয়ে পড়ে। বিদ্যমান বহরে রয়েছে চারটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর, চারটি বোয়িং ৭৮৭-৮, দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯, চারটি বোয়িং ৭৩৭ এবং পাঁচটি ড্যাশ-৮-৪০০ উড়োজাহাজ।

অভ্যন্তরীণ রুটের পাশাপাশি বর্তমানে ২২টি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করছে বিমান এবং মালদ্বীপের মালে, ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা, শ্রীলঙ্কার কলম্বো ও অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে নতুন রুট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে যেগুলোকে সম্ভাবনাময় লাভজনক গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি ও মার্চে কানাডায় নির্মিত দুটি ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত হওয়ার পর থেকে আর কোনো নতুন উড়োজাহাজ যোগ করতে পারেনি বিমান কর্তৃপক্ষ। ইউরোপ না যুক্তরাষ্ট্র কোথা থেকে বিমান কেনা হবে, এ সিদ্ধান্তহীনতাই বহর সম্প্রসারণে দীর্ঘ বিলম্বের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল এতদিন।

আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রী বৃদ্ধি ও বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোর তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে ২০২৪ সালে ১০ বছর মেয়াদি একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা গ্রহণ করে বিমান যেখানে ২৬টি নতুন উড়োজাহাজ কেনা ও রুট সম্প্রসারণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। এরপর বোয়িং ও এয়ারবাস বিভিন্ন প্রস্তাব টেবিলে উপস্থাপন করেছে। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও কোনো নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি চূড়ান্ত করতে পারেনি বিমান।

শেষ পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকার গত ৩০ ডিসেম্বর বিমানের পরিচালনা পর্ষদ নীতিগতভাবে বোয়িং থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। এর ধারাবাহিকতাই রক্ষা করছে বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার।

বিমানের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোশরা ইসলাম জানান, নতুন বোয়িং উড়োজাহাজের প্রথম ডেলিভারি পেতে ২০৩১ সালের নভেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ফলে স্বল্পমেয়াদে উড়োজাহাজ সংকট নিরসনের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।