মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি : ইতালিতে বড় ভাইয়ের হাতে ছোট ভাই খুনের আলোচিত ঘটনার পেছনে ছিল অর্থ লেনদেন, দ্বিতীয় বিয়ে এবং দীর্ঘদিনের পারিবারিক দ্বন্দ্বের জটিল পটভূমি।
মুন্সীগঞ্জের টংগিবাড়ী উপজেলার সোনারং গ্রামের প্রবাসী দুই ভাই—হুমায়ুন ফকির (৩৫) ও নয়ন ফকির (২৫)। বৃহস্পতিবার ইতালির লেচ্চে শহরে স্থানীয় সময় রাত আনুমানিক ৮টার দিকে বড় ভাই হুমায়ুন ছুরিকাঘাতে ছোট ভাই নয়নকে হত্যা করেন। ঘটনাস্থলেই নয়নের মৃত্যু হয়।
হত্যার পরপরই ঘটনা আরও চাঞ্চল্যকর মোড় নেয়। স্বজনদের সঙ্গে ভিডিওকলে যুক্ত হয়ে হুমায়ুন নিজেই হত্যার কথা স্বীকার করেন এবং রক্তাক্ত লাশ দেখান। এতে পরিবার ভেঙে পড়ে এবং দ্রুত পুরো এলাকায় খবরটি ছড়িয়ে পড়ে।
শুক্রবার সরেজমিনে নিহতের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোক আর কান্নায় ভারী পরিবেশ। পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রায় ৮-৯ বছর আগে হুমায়ুন অবৈধ পথে ইতালিতে যান। পরে চার বছর আগে প্রায় ১৩ লাখ টাকা খরচ করে ছোট ভাই নয়নকে সেখানে নিয়ে যান।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সম্প্রতি বাবা-মায়ের জন্য দেশে পাঠানো প্রায় ১৬ লাখ টাকার অর্ধেক ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে দুই ভাইয়ের মধ্যে বিরোধ তীব্র হয়। যদিও নয়ন সেই টাকা দিতে রাজি ছিলেন এবং ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য অর্থ পরিশোধও করেছেন বলে হুমায়ুনের মা বিউটি বেগম দাবি করেন।
তবে বিরোধের কেন্দ্র আরও গভীরে। হুমায়ুনের দ্বিতীয় বিয়ে পরিবারে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করে। প্রথম স্ত্রী থাকা অবস্থায় আত্মীয় এক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে দেশে এসে তাকে বিয়ে করেন তিনি। বিষয়টি পরিবার মেনে না নেওয়ায় বিরোধ চরমে ওঠে। বাবা দেলোয়ার ফকির নতুন স্ত্রীকে বাড়িতে তুলতে আপত্তি জানালে সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়।
নিহতের বোন দিলারা আক্তার দাবি করেন, হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিত। তার ভাষ্য, আগে থেকেই ছুরি নিয়ে ওত পেতে ছিল হুমায়ুন। সুযোগ বুঝে পেছন থেকে আঘাত করে এবং পরে মাথায় আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করে।
হুমায়ুনের প্রথম স্ত্রী আমেনা আফরিন অভিযোগ করেন, বিয়ের আগ থেকেই তার অন্য নারীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। দ্বিতীয় বিয়ের পর ঠিকমতো ভরণপোষণ না দিয়ে বাড়ি ছাড়তে চাপ দেওয়া হয় এবং ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে তালাকের প্রস্তাব দেওয়া হয়। শর্তে আমি রাজি হই।
অন্যদিকে দ্বিতীয় স্ত্রী তায়েবা আক্তার বলেন, তাদের বিয়ে পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতেই হয়েছে, তবে দুই ভাইয়ের দ্বন্দ্ব মূলত টাকার বিষয়কে কেন্দ্র করেই ছিল।
পুলিশ সূত্র জানায়, ঘটনার দুই দিন আগে ইতালি থেকে হুমায়ুন থানায় ফোন করে ১৩ লাখ টাকা পাওনার বিষয়টি জানান। লিখিত অভিযোগ না থাকায় তখন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরে তার প্রথম স্ত্রীকে দিয়ে একটি অভিযোগ করানো হয়।
টংগিবাড়ী থানার ওসি মনিরুল ইসলাম ডাবলু বলেন, পারিবারিক দ্বন্দ্বের জেরেই বিদেশে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। স্থানীয়ভাবে অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
সব তথ্য মিলিয়ে অনুসন্ধানে যা উঠে আসে, তা হলো—অর্থনৈতিক চাপ, দাম্পত্য জটিলতা এবং পারিবারিক বিরোধ ধীরে ধীরে এমন এক অবস্থায় পৌঁছায়, যেখানে রক্তের সম্পর্কও শেষ পর্যন্ত সহিংসতার কাছে পরাজিত হয়।