রবিবার, ১০ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৭ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২২ জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

চুল পড়া থামানোর কি আসলে কোনো সল্যুশন আছে?

মো. হাফিজ উদ্দিন :

মাথার চুল পড়ে যাওয়া নিয়ে আজকাল অনেকেরই দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। ছেলে-মেয়ে, যুবক-যুবতী থেকে শুরু করে মধ্যবয়সীরাও এই সমস্যায় ভুগছেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে বালিশে চুল দেখে মন খারাপ হয়ে যায়, চিরুনিতে আটকে থাকা চুলের গোছা দেখে হতাশা বাড়ে। এই দুশ্চিন্তা নিজেই আবার চুল পড়া বাড়িয়ে দেয়—এমন একটা ভয়ংকর চক্র তৈরি হয়। অথচ সঠিক সচেতনতা, জীবনযাপনের পরিবর্তন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিলে অনেক ক্ষেত্রে চুল পড়া উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো বা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে নতুন চুল গজানোরও সম্ভাবনা থাকে।
এম এইচ শমরিতা হাসপাতাল অ্যান্ড মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ন্যাশনাল স্কিন সেন্টারের চেয়ারম্যান ও চিফ কনসালট্যান্ট অধ্যাপক ডা. এম ইউ কবীর চৌধুরী বলেন, চুল পড়া একেবারে অস্বাভাবিক কিছু নয়। বরং এটি চুলের স্বাভাবিক জীবনচক্রের অংশ। তবে যখন এই পড়ার হার স্বাভাবিক সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখনই এটি সমস্যায় পরিণত হয়। একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন ৩০ থেকে ১০০টি চুল পড়া স্বাভাবিক। কিন্তু এর চেয়ে বেশি পড়লে বা চুল পাতলা হয়ে যেতে দেখলে সতর্ক হওয়া উচিত।
চুলের জীবনচক্র তিনটি প্রধান ধাপে বিভক্ত: অ্যানাজেন (বৃদ্ধির পর্যায়), ক্যাটাজেন (স্থানান্তরকালীন) এবং টেলোজেন (বিশ্রাম ও ঝরে পড়ার পর্যায়)। সাধারণত মাথার ৯০ শতাংশ চুল অ্যানাজেন পর্যায়ে থাকে, যেখানে চুল সক্রিয়ভাবে বাড়তে থাকে। বাকি অংশ বিশ্রামে থাকে এবং পরে ঝরে পড়ে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন চুল গজানোর হার কমে যায়, পুরোনো চুল ঝরে পড়ার হার বাড়ে। ফলে ধীরে ধীরে মাথায় চুলের ঘনত্ব কমতে থাকে।
চুল পড়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। প্রথমত, পুষ্টির অভাব। শরীরে প্রোটিন, আয়রন, জিংক, ভিটামিন বি কমপ্লেক্স (বিশেষ করে বায়োটিন এবং বি১২) এর ঘাটতি থাকলে চুল দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সহজে ঝরে যায়। অনেক সময় অতিরিক্ত ভিটামিন এ বা অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবারও চুল পড়ার কারণ হতে পারে। মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা, অনিয়মিত ঘুম, ধূমপান—এসবও চুলের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
ভাইরাল জ্বর, টাইফয়েড, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়ার পর অনেকের চুল বেশি পড়তে দেখা যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলা হয় পোস্ট ফেব্রাইল এফ্লুভিয়াম। এ ধরনের চুল পড়া সাধারণত সাময়িক এবং কয়েক মাসের মধ্যে সেরে যায়, যদি শরীর পুষ্টি পায় এবং বিশ্রাম নেওয়া হয়। নারীদের ক্ষেত্রে থাইরয়েডের সমস্যা, গর্ভাবস্থা বা সন্তান প্রসবের পর হরমোনের পরিবর্তনের কারণে চুল পড়া বেড়ে যায়—যাকে পোস্টপারটাম এফ্লুভিয়াম বলা হয়।
জেনেটিক কারণও চুল পড়ার অন্যতম প্রধান নিয়ামক। অ্যান্ডোজেনেটিক অ্যালোপেসিয়া নামে পরিচিত এই অবস্থায় অ্যান্ড্রোজেন হরমোন, বিশেষ করে ডাইহাইড্রোটেস্টোস্টেরন (ডিএইচটি) চুলের ফলিকলকে সংকুচিত করে। পুরুষদের ক্ষেত্রে এটি মেল প্যাটার্ন বাল্ডনেস (কপাল ও মাথার উপরের অংশ ফাঁকা হয়ে যাওয়া) এবং নারীদের ক্ষেত্রে ফিমেল প্যাটার্ন হেয়ার লস (চুল পাতলা হয়ে যাওয়া) হিসেবে দেখা দেয়। এটি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে এবং বয়সের সঙ্গে তীব্রতা পায়।
অটোইমিউন রোগগুলোও চুল পড়ার জন্য দায়ী হতে পারে। অ্যালোপেসিয়া এরিয়াটা-তে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিজের চুলের ফলিকলকে আক্রমণ করে, ফলে মাথায় গোলাকার গোলাকার টাক পড়ে যায়। ছেলে-মেয়ে উভয়েরই হতে পারে। সিস্টেমিক লুপাস ইরাইথেমাটোসাস (এসএলই), ডিসকয়েড লুপাস বা লাইকেন প্ল্যানাসের মতো রোগেও চুল পড়ে।
জীবনযাপনের অভ্যাসও বড় ভূমিকা রাখে। ট্র্যাকশন অ্যালোপেসিয়া হয় দীর্ঘদিন চুলে টান পড়লে—যেমন শক্ত করে বেঁধে রাখা, ঘন ঘন টানাটানি করা। হেলমেটের ঘাম ও ঘর্ষণ, অপরিচ্ছন্ন স্কাল্পে খুশকি, ব্যাকটেরিয়া বা ফাঙ্গাস সংক্রমণও ফলিকল নষ্ট করে চুল পড়ায়। আধুনিক জীবনে স্ট্রেইটনার, হেয়ার ড্রায়ারের অতিরিক্ত তাপ, বারবার কেমিক্যাল ট্রিটমেন্ট, হেয়ার কালার ব্যবহার এবং ভেজা চুল আঁচড়ানো চুলের গোড়া দুর্বল করে দেয়।
চুল পড়া কি সত্যিই রোধ করা সম্ভব?:
অধ্যাপক ডা. এম ইউ কবীর চৌধুরী জোর দিয়ে বলেন, অনেক ক্ষেত্রে চুল পড়া নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কারণ চিহ্নিত করে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলে ফলাফল ভালো পাওয়া যায়। কিছু চুল পড়া সাময়িক, আবার কিছু দীর্ঘমেয়াদি। তাই অন্ধভাবে বিজ্ঞাপনের ওষুধ বা তেল ব্যবহার না করে বিশেষজ্ঞ চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের (ডার্মাটোলজিস্ট) পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
অ্যালোপেসিয়া এরিয়াটার ক্ষেত্রে ইমিউনো সাপ্রেসিভ লোশন, ক্রিম বা মিনোক্সিডিল ব্যবহারে নতুন চুল গজাতে পারে। অ্যান্ড্রোজেনেটিক অ্যালোপেসিয়ায় মিনোক্সিডিল লোশন, ফিনাস্টেরাইড ট্যাবলেট (পুরুষদের ক্ষেত্রে), প্লেটলেট রিচ প্লাজমা (পিআরপি) থেরাপি এবং প্রয়োজনে হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট কার্যকরী। ফাঙ্গাস সংক্রমণ হলে অ্যান্টিফাঙ্গাল শ্যাম্পু ও ওষুধ, ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনে অ্যান্টিবায়োটিক দরকার হয়।
পুষ্টির দিকে বিশেষ নজর দিতে হয়। প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার—মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ডাল—নিয়মিত খাওয়া উচিত। আয়রনের জন্য পালংশাক, লাল মাংস, ড্রাই ফ্রুটস; জিংকের জন্য বাদাম, বীজ; বায়োটিনের জন্য ডিম, অ্যাভোকাডো, বাদাম খাওয়া ভালো। সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা জরুরি। অতিরিক্ত চর্বি, কার্বোহাইড্রেট বা ভিটামিন এ যুক্ত খাবার কমিয়ে আনতে হবে। প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শে সাপ্লিমেন্ট নেওয়া যেতে পারে।
মানসিক চাপ কমানোর জন্য নিয়মিত ব্যায়াম, মেডিটেশন, যোগব্যায়াম এবং পর্যাপ্ত ঘুম অপরিহার্য। দিনে অন্তত ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমানো উচিত। ধূমপান একেবারে বন্ধ করতে হবে, কারণ এটি চুলের ফলিকলে রক্ত সঞ্চালন কমিয়ে দেয়।
জ্বরের পর চুল পড়া সাধারণত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কমে যায়। তবে সেই সময় পুষ্টিকর খাবার, চুলের সঠিক যত্ন এবং বিশ্রাম নিলে দ্রুত সেরে ওঠে।
চুলের দৈনন্দিন যত্নেও অনেক কিছু নির্ভর করে। হালকা, সালফেট-ফ্রি শ্যাম্পু ব্যবহার করুন। গরম পানি দিয়ে চুল না ধোয়াই ভালো—ঠান্ডা বা কুসুম গরম পানি ব্যবহার করুন। চুলে অতিরিক্ত তাপ দেওয়া, কেমিক্যাল ট্রিটমেন্ট বা ঘন ঘন কালার করা থেকে বিরত থাকুন। ভেজা চুল কখনো জোর করে আঁচড়াবেন না। চওড়া দাঁতের চিরুনি ব্যবহার করুন এবং আলতো করে চুল সামলান।
ট্র্যাকশন অ্যালোপেসিয়া এড়াতে চুল শক্ত করে বাঁধবেন না। হেলমেট ব্যবহার করলে ভেতরে সুতির কাপড় ব্যবহার করুন এবং নিয়মিত পরিষ্কার রাখুন। খুশকি থাকলে তা নিয়ন্ত্রণে রাখুন, কারণ খুশকি ফলিকলের প্রদাহ বাড়ায়।
অন্যান্য রোগ যেমন থাইরয়েড, লুপাস ইত্যাদির চিকিৎসা করালে চুল পড়াও কমে। তাই মূল রোগ চিহ্নিত করে চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি:
বর্তমানে চুল পড়ার চিকিৎসায় বেশ কিছু অগ্রগতি হয়েছে। মিনোক্সিডিল (২% বা ৫%) লোশন বা ফোম স্কাল্পে লাগালে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে এবং চুলের বৃদ্ধি উদ্দীপিত হয়। ফিনাস্টেরাইড ডিএইচটি হরমোন কমিয়ে জেনেটিক টাক পড়া রোধ করে। নারীদের ক্ষেত্রে সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করতে হয়।
পিআরপি থেরাপিতে রোগীর নিজের রক্ত থেকে প্লেটলেট সমৃদ্ধ প্লাজমা আলাদা করে স্কাল্পে ইনজেকশন দেওয়া হয়। এতে গ্রোথ ফ্যাক্টর চুলের ফলিকলকে পুনরুজ্জীবিত করে। অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, মিনোক্সিডিলের সঙ্গে পিআরপি ব্যবহারে আরও ভালো ফল পাওয়া যায়। হেয়ার ট্রান্সপ্লান্টে স্থায়ী সমাধান মিলতে পারে, যেখানে শরীরের অন্য অংশের (সাধারণত পেছনের মাথা) সুস্থ ফলিকল টাক অংশে প্রতিস্থাপন করা হয়।
লো লেভেল লেজার থেরাপি, মেসোথেরাপি ইত্যাদিও কার্যকরী হতে পারে। তবে সব চিকিৎসাই ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে করা উচিত।
প্রতিরোধই শ্রেষ্ঠ উপায়:
চুল পড়া পুরোপুরি বন্ধ করা সবসময় সম্ভব নয়, বিশেষ করে জেনেটিক কারণে। কিন্তু সঠিক যত্নে এর গতি অনেক কমানো যায় এবং চুলের স্বাস্থ্য ভালো রাখা যায়। প্রতিদিনের রুটিনে সুষম খাবার, স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট, নিয়মিত চুল ধোয়া (অতিরিক্ত নয়), হালকা তেল মাসাজ (নারকেল, অলিভ বা ক্যাস্টর অয়েল), এবং স্কাল্প পরিষ্কার রাখা অভ্যাস করুন।
বাংলাদেশের মতো দেশে পুষ্টির অভাব, দূষণ এবং চাপের কারণে চুল পড়া বেশি দেখা যায়। তাই সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। শিশুকাল থেকেই সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুললে পরবর্তী জীবনে চুলের সমস্যা কম হয়।
অনেকে ঘরোয়া উপায়ে—যেমন পেঁয়াজের রস, আদা-রসুলের মিশ্রণ, মেথি, আমলকী ইত্যাদি—ব্যবহার করে উপকার পান। এগুলো সহায়ক হতে পারে, কিন্তু মূল চিকিৎসার বিকল্প নয়।
উপসংহার:
চুল পড়া নিয়ে অযথা দুশ্চিন্তা না করে কারণ খুঁজে বের করুন এবং বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন। সুস্থ জীবনযাপন, সঠিক যত্ন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসায় অনেকাংশে চুলের সৌন্দর্য ও স্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব। মনে রাখবেন, চুল শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, সামগ্রিক স্বাস্থ্যেরও একটি আয়না। সুস্থ থাকুন, চুলও সুস্থ থাকবে।