বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৭ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৩ জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়ে টানাপোড়েন, যুবদলের নেতৃত্বে আসছেন কারা?

মুক্তবাণী রিপোর্ট : তিন বছর মেয়াদি কমিটির দুই বছর পার হলেও এখনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে পারেনি জাতীয়তাবাদী যুবদল। দীর্ঘদিন ধরে মাত্র সাত সদস্যের আংশিক কমিটি দিয়ে সংগঠন চলায় পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন ইউনিটের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মতবিনিময়ের পর যুবদলের নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

নতুন কমিটিতে পদ পেতে সাবেক ছাত্রনেতা ও যুবদলের সাবেক শীর্ষ পদধারী একঝাঁক নেতা জোর লবিং-তদবির শুরু করায় রাজনীতির মাঠে এখন মূল আলোচনা, যুবদলের আগামী নেতৃত্বে আসছেন কারা?

২০২৪ সালের ৯ জুলাই মোনায়েম মুন্নাকে সভাপতি এবং নুরুল ইসলাম নয়নকে সাধারণ সম্পাদক করে জাতীয়তাবাদী যুবদলের সাত সদস্যের আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। সে সময় দ্রুতই পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেওয়ার কথা জানানো হলেও, প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও তা আর আলোর মুখ দেখেনি।

দীর্ঘদিনেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে সংগঠনের ভেতরে। যুবদলের একাধিক নেতার অভিযোগ, এই আংশিক কমিটিকে কেন্দ্র করে সভাপতি মোনায়েম মুন্নার একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

তাদের দাবি, গত ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর সংগঠনের অভ্যন্তরে সভাপতির একক প্রভাব বিস্তারের এই প্রবণতা আরও বেড়েছে।

উৎপাদনমুখী রাজনীতি, মুক্তবাজার অর্থনীতি ও গণতন্ত্রের মাধ্যমে সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং সৎ, মেধাবী ও নিঃস্বার্থ যুবকদের সমন্বয়ে আদর্শবান নেতৃত্ব গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৭৮ সালের ২৭ অক্টোবর যুবদল প্রতিষ্ঠা করেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।

তবে বিএনপির অনেক নেতা মনে করেন, যে আদর্শ ও লক্ষ্য সামনে রেখে যুবদল গঠন করা হয়েছিল, বাস্তবে সংগঠনটি এখন সেখান থেকে অনেকটাই বিচ্যুত।

হতাশা প্রকাশ করে তারা বলেন, যুবসমাজের উন্নয়নে সংগঠনটি দৃশ্যমান কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না, এমনকি আদর্শভিত্তিক নেতৃত্ব তৈরিতেও ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। দীর্ঘ সময়েও একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে না পারাকে বর্তমান নেতৃত্বের বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা।

এর পাশাপাশি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সংগঠনটির কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে সংগঠনের সামগ্রিক ভাবমূর্তি ও ঐতিহ্য বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

যুবদলের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, ইতোমধ্যে ১৫১ এবং ২৫১ সদস্যবিশিষ্ট দুটি সম্ভাব্য পূর্ণাঙ্গ কমিটির খসড়া তালিকা অনুমোদনের জন্য বিএনপির হাইকমান্ডের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।

পদপ্রত্যাশী নেতাদের অভিযোগ, এই খসড়া তালিকায় ত্যাগী ও যোগ্য নেতাদের অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। বর্তমান আংশিক কমিটির শীর্ষ নেতারা দলের চেয়ে নিজেদের ঘনিষ্ঠ ও অনুসারীদের প্রাধান্য দিয়ে তালিকা তৈরি করেছেন।

এই পরিস্থিতিতে সংগঠনটির একটি বড় অংশের দাবি, বর্তমান আংশিক কমিটি ভেঙে দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন প্রক্রিয়ায় যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হোক।

এর আগে যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন বলেছিলেন, আমি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছি। এখন দল যদি আমাকে সংগঠনে না রেখে অন্য কোথাও দায়িত্ব দিতে চায়, আমি তা মেনে নেব। আবার সংগঠনে রাখতে চাইলেও আমার কোনো সমস্যা নেই। মোটকথা, দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

যুবদলের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, তাদের সাংগঠনিক অভিভাবক ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। গত ৯ মে রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে যুবদলের বিভিন্ন সাংগঠনিক ইউনিটের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন।

কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটের বৈঠকে অংশ নেওয়া এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যুবদলের নতুন কমিটিকে কেন্দ্র করে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ওয়ান-টু-ওয়ান কথা বলেছেন। যারা আগামীতে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দলকে এগিয়ে নিতে পারবেন এবং বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন, এমন নেতাদের দিয়েই আগামী কমিটি হবে, এমন আভাস দিয়েছেন তিনি।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, সহযোগী সংগঠনগুলোর পুনর্গঠনের কার্যক্রম চলমান আছে। কবে নাগাদ নতুন কমিটি আসবে তা এখনই সুনির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। দলের চেয়ারম্যান দায়িত্বশীল নেতাদের নিয়ে কাজ করছেন। আশা করি, দ্রুত সময়ের মধ্যেই অঙ্গ সংগঠন পুনর্গঠন করা হবে।

সভাপতি-সম্পাদকসহ পাঁচ পদে আলোচনায় যারা :

যুবদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মামুন হাসান, সাবেক ১ম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা শাহীন, সাবেক সহ-সভাপতি রুহুল আমিন আকিল, যুবদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইদ ইকবাল টিটো, মাহবুবুল হাসান পিংকু, দীপু সরকার, কামরুজ্জামান দুলাল, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের আহ্বায়ক এনামুল হক এনাম, সিনিয়র সহ-সভাপতি রেজাউল কবীর পল, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বিল্লাল হোসেন তারেক, ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান, সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মামুনুর রশীদ মামুন, সাইদ ইকবাল টিটু, সাবেক সহ-শিল্প বিষয়ক সম্পাদক আসাদুল আলম টিটু, ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক শরীফ উদ্দিন জুয়েল, দক্ষিণের সদস্য সচিব রবিউল ইসলাম নয়ন, ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন, ইকবাল হোসেন শ্যামল এবং ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল।

যুবদলের পদপ্রত্যাশী সংগঠনটির সাবেক কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক গোলাম মাওলা শাহীন বলেন, ওয়ার্ড ছাত্রদলের রাজনীতির মধ্য দিয়েই আমার রাজনৈতিক পথচলা শুরু। শুরু থেকেই আমি বিএনপির আদর্শকে ধারণ করে রাজনীতি করে আসছি। দল আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে, পরিচিতি দিয়েছে, সম্মান দিয়েছে। দেশনেত্রী খালেদা জিয়া এবং জুলাই আন্দোলনের রূপকার বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান আমাদের পথ দেখিয়েছেন, সাহস জুগিয়েছেন।

তিনি বলেন, এখন যেমন দলের সুসময় এসেছে, তেমনি সামনে বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের নেতা যাকে যোগ্য মনে করবেন, যার ওপর আস্থা রাখবেন, তাকেই সামনে নিয়ে আসবেন। আমরা দলের সিদ্ধান্তকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আগামী দিনের পথচলা এগিয়ে নিতে চাই।

যুবদলের সাবেক সহ-সভাপতি ও সাবেক দপ্তর দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা কামরুজ্জামান দুলাল বলেন, বর্তমান পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতাকর্মীরা যুবদলের সব পর্যায়ে নতুন নেতৃত্ব প্রত্যাশা করছেন।

তিনি বলেন, দীর্ঘ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের নিয়ে কাজ করেছেন। তিনি জানেন, কাদের নেতৃত্বে আনলে সংগঠন আবারও গতিশীল হবে এবং ফ্যাসিস্ট হাসিনা-পরবর্তী সময়ে সংগঠনকে যে নেতিবাচক ভাবমূর্তির মুখোমুখি হতে হয়েছে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে। তৃণমূল নেতাকর্মীরা বিশ্বাস করেন, চেয়ারম্যান এ বিষয়ে সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নেবেন।

বর্তমান যুবদল কমিটির সমালোচনা করে তিনি বলেন, সংগঠনকে গতিশীল করা এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বর্তমান কমিটি পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। যার ফলে দেশের সব ইউনিটে সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে।

যুবদলের সাবেক সহ-সভাপতি মাহবুবুল হাসান পিংকু বলেন, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান ‍যদি আমাকে যোগ্য মনে করে নেতৃত্বে আনেন, তাহলে সারাদেশে যুবদলকে আরও সংগঠিত ও গতিশীল করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।

ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির সঙ্গে আছি। ছাত্রদলের সভাপতি ছিলাম। দল যদি আমাদের কোনো জায়গায় দায়িত্ব দেয়, তবে অবশ্যই সাদরে গ্রহণ করবো।

ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল বলেন, সংগঠনের অভিভাবক ও দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে দায়িত্ব দিয়েছেন তা শতভাগ পালন করার চেষ্টা করেছি। সব সময় আন্দোলন-সংগ্রামের অগ্রভাগে অবস্থান নিয়েছি। এখন সংগঠনের অভিভাবক নির্ধারণ করবেন। তিনি যে দিকনির্দেশনা দেবেন বা যে দায়িত্ব দেবেন, তা মাথা পেতে নেবো।