নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের ধর্মীয়, প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অঙ্গনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। সরকার দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক (গ্রেড-১) পদে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের পেশ ইমাম, বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, গবেষক ও শিক্ষাবিদ মুফতি মুহাম্মদ মুহিববুল্লা হিল বাকীকে নিয়োগ দিয়েছে।
শুক্রবার (২২ মে) ইসলামিক ফাউন্ডেশন এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, এ নিয়োগ দেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, কারণ এই প্রথম কোনো পেশাদার আলেম ও মসজিদের ইমামকে সচিব পদমর্যাদার প্রশাসনিক উচ্চ পদে দায়িত্ব প্রদান করা হলো।
বৃহস্পতিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এ নিয়োগের বিষয়টি জানানো হয়।
প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয় যে, ইসলামিক ফাউন্ডেশন আইন, ১৯৭৫-এর ধারা ৫(ক)(১) ও ৫(ক)(২) অনুযায়ী তাকে অন্যান্য পেশাগত বা প্রাতিষ্ঠানিক সংশ্লিষ্টতা পরিত্যাগের শর্তে যোগদানের তারিখ থেকে পরবর্তী এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন জানায়, ধর্মীয় জ্ঞান, আধুনিক শিক্ষা, গবেষণা, নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক বিচক্ষণতার এক অনন্য সমন্বয় হিসেবে মুফতি মুহিববুল্লা হিল বাকী দীর্ঘদিন ধরে দেশের ইসলামী অঙ্গনে বিশেষভাবে সমাদৃত।
তিনি এমন এক আলেম, যিনি কওমি, আলিয়া ও আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার সমন্বয়ে নিজেকে গড়ে তুলেছেন। শিক্ষাজীবনে তিনি চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদ্রাসা, ভারতের প্রসিদ্ধ দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগে অধ্যয়ন করেন।
কওমি শিক্ষায় দাওরায়ে হাদিস, আলিয়া শিক্ষায় কামিল এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের মাস্টার্স—সব ক্ষেত্রেই তিনি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। বিশেষত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগ থেকে মাস্টার্স পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন তার অসাধারণ মেধা ও একাডেমিক সাফল্যের প্রমাণ বহন করে।
কর্মজীবনে তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক, গবেষক ও প্রশিক্ষক হিসেবে বহু প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন। আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম-সহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি চট্টগ্রামের দারুল মারিফ ও দারুল উলুম মাদ্রাসা-সহ একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ সময় ধরে ইসলামী জ্ঞানচর্চা ও পাঠদানে নিয়োজিত ছিলেন। তার হাতে অসংখ্য শিক্ষার্থী ধর্মীয় জ্ঞান ও নৈতিক শিক্ষায় আলোকিত হয়েছেন।
ধর্মীয় অঙ্গনে তার গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা দীর্ঘদিনের। তিনি চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ এবং জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে ইমামতি করেছেন। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মসজিদে খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করে ইসলামের মধ্যপন্থা, মানবিকতা, সহনশীলতা ও শান্তির বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
দেশের ইসলামী অর্থনীতি ও শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার উন্নয়নেও রয়েছে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান। সর্বশেষ তিনি সেন্ট্রাল শরীয়াহ কাউন্সিল ফর ইসলামী ব্যাংকস অব বাংলাদেশ-এর মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। পাশাপাশি স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক পিএলসি-এর শরিয়াহ বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি ইসলামী উইংয়ের শরিয়াহ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি, সোনালী ব্যাংক পিএলসি, প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসি, ইউনিয়ন ব্যাংক পিএলসি, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসি, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক পিএলসি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পিএলসি ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক-সহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শরিয়াহ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতার বিচারক হিসেবেও সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশ ছাড়াও মিশর ও ভারত-এ আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় বিচারক হিসেবে অংশগ্রহণ তার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও বিদ্যাগত মর্যাদার প্রতিফলন। আরবি, উর্দু, হিন্দি, ফারসি, ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় তার সমান দক্ষতা তাকে বহুভাষিক ও বহুমাত্রিক জ্ঞানচর্চার একজন ব্যতিক্রমী আলেমে পরিণত করেছে।
ইসলামিক ফাউণ্ডেশন মনে করে, তার এই নিয়োগ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কার্যক্রমে নতুন গতি, আধুনিকতা, গবেষণানির্ভর পরিকল্পনা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধভিত্তিক সামাজিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে আরও বেগবান করবে। একই সঙ্গে দেশের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহে দক্ষ, শিক্ষিত ও প্রজ্ঞাবান আলেমদের সম্পৃক্ততার একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন পরিবার নবনিযুক্ত মহাপরিচালক মুফতি মুহাম্মদ মুহিববুল্লা হিল বাকী-এর সফল দায়িত্ব পালন কামনা করছে এবং তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি আরও গতিশীল, জনমুখী ও সময়োপযোগী ভূমিকা পালন করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করছে।