নিজস্ব প্রতিবেদক : বছরের পর বছর অচল পড়ে থাকা দেশের কয়েকটি আঞ্চলিক বিমানবন্দর পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রথম পর্যায়ে বগুড়া ও ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দরকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
এর মধ্যে বগুড়ায় আন্তর্জাতিক মানের নতুন বিমানবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা ইতোমধ্যে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) বোর্ড সভায় অনুমোদন পেয়েছে। একইসঙ্গে ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর পুনরায় সচল করার প্রস্তুতিও এগিয়ে চলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দীর্ঘদিন ব্যবহারহীন অবস্থায় থাকা এসব বিমানবন্দর চালু করা গেলে আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, পর্যটন সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল ও দেশের দূরবর্তী এলাকাগুলোর সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ আরও সহজ হবে।
ইতোমধ্যে কয়েকটি বিমানবন্দরের অবকাঠামো, যাত্রী চাহিদা ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা যাচাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে।
সম্প্রতি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রীতা জানিয়েছেন, জনগণের চাহিদা এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে বন্ধ বিমানবন্দরগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ করে বিমানবন্দরগুলো সচল করা হবে।
এদিকে বগুড়া বিমানবন্দর পরিদর্শন শেষে ঢাকায় ফিরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানান, দেশের সাত থেকে আটটি বিমানবন্দর দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে বগুড়া বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বগুড়া বাংলাদেশের মাঝামাঝি অবস্থানে। তাই এখানে একটি ভালো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর গড়ে তোলার সুযোগ আছে কি না, সেটি আমরা খতিয়ে দেখছি।
প্রতিমন্ত্রী জানান, বগুড়াকে কেন্দ্র করে একটি এভিয়েশন হাব বা কার্গো পরিবহনের কেন্দ্র গড়ে তোলার সম্ভাবনাও রয়েছে। এজন্য শিগগিরই সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু বগুড়া নয়, দেশের আরও কয়েকটি আঞ্চলিক বিমানবন্দর চালু হলে স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে, পর্যটন খাতও উপকৃত হবে।
বিমান চলাচল খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ছোট বিমানবন্দর চালু করলে শুরুতে আর্থিক লাভ কম হতে পারে। তবে এর ফলে যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি হবে, তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য লাভজনক হবে।
তাদের মতে, একটি বিমানবন্দর শুধু বিমান ওঠানামার জায়গা নয়। এটিকে ঘিরে হোটেল, পরিবহন, ব্যবসা, পর্যটনসহ নানা ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে ওঠে। তাই শুধু বিমানবন্দরের আয়-ব্যয় দিয়ে এর লাভ-ক্ষতি বিচার করলে হবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শমশেরনগর বিমানবন্দর চালু হলে শ্রীমঙ্গল ও আশপাশের পর্যটন এলাকায় যাতায়াত সহজ হবে। অন্যদিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে ঈশ্বরদীতে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের যাতায়াত বাড়ছে। ফলে ওই বিমানবন্দরটিরও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে।
এ ছাড়া লালমনিরহাট ও ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর চালু হলে উত্তরাঞ্চলের মানুষের ঢাকায় যাতায়াত অনেক সহজ হবে। বর্তমানে এসব অঞ্চলের মানুষকে সড়ক বা রেলপথে দীর্ঘ সময় ভ্রমণ করতে হয়।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিবেচনায় অভ্যন্তরীণ বিমান যোগাযোগ সম্প্রসারণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। আঞ্চলিক বিমানবন্দরগুলো চালু করা গেলে যাত্রীসেবা বাড়বে, সময় বাঁচবে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ আরও দ্রুত হবে।
মূলত পরিত্যক্ত বিমানবন্দরগুলো আবার সচল করা গেলে স্থানীয় পর্যায়ে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে পর্যটন ও বাণিজ্য খাতেও নতুন গতি আসবে। দীর্ঘদিন নীরব থাকা রানওয়েগুলোতে আবারও বিমান উড়তে শুরু করলে তার সুফল পাবে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষ ও দেশের অর্থনীতি।
জানা যায়, সরকারের পরিকল্পনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বগুড়া বিমানবন্দর। দেশের কেন্দ্রীয় অবস্থানের কারণে এটিকে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও কার্গো পরিবহনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার চিন্তা করা হচ্ছে।
প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেখানে ১০ হাজার ৫০০ ফুট দীর্ঘ রানওয়ে নির্মাণ করা হবে। এতে বোয়িং ৭৩৭-৮০০সহ বড় আকারের যাত্রী ও কার্গো উড়োজাহাজ ওঠানামা করতে পারবে। এ ছাড়া আধুনিক টার্মিনাল ভবন, নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার, কার্গো কমপ্লেক্স এবং প্রতিকূল আবহাওয়ায় নিরাপদ উড্ডয়ন ও অবতরণের জন্য উন্নত প্রযুক্তি সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পটির নকশা ও কারিগরি সমীক্ষার জন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে (বুয়েট) পরামর্শক হিসেবে নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে বেবিচক ও বুয়েটের প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠক হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, পরামর্শক নিয়োগের ছয় মাসের মধ্যে প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ নকশা ও উন্নয়ন প্রস্তাব প্রস্তুত করা সম্ভব হবে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত কয়েকশ একর জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ব্যয় তিন হাজার কোটি টাকারও বেশি হতে পারে।
ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দরেও নতুন প্রাণ:
উত্তরাঞ্চলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর। ১৯৪০ সালে প্রতিষ্ঠিত বিমানবন্দরটি দীর্ঘদিন ধরেই বন্ধ রয়েছে। স্বাধীনতার আগে ও পরে বিভিন্ন সময়ে এটি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও যাত্রী সংকটের কারণে বাণিজ্যিক কার্যক্রম টেকসই হয়নি।
বর্তমানে বিমানবন্দরের অধিকাংশ স্থাপনা জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বেবিচকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিমানবন্দরটি আধুনিকায়নে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। প্রথম ধাপে জমি অধিগ্রহণ, রানওয়ে সম্প্রসারণ এবং নতুন টার্মিনাল ও নিরাপত্তা অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। পরে রানওয়ের দৈর্ঘ্য আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
সম্প্রতি মন্ত্রণালয় ও বেবিচকের উচ্চপর্যায়ের একটি দল বিমানবন্দরটি পরিদর্শন করেছে।
আরও ছয় বিমানবন্দর চালুর চিন্তা:
বগুড়া ও ঠাকুরগাঁওয়ের পাশাপাশি লালমনিরহাট, ঈশ্বরদী, কুমিল্লা, শমশেরনগর, খানজাহান আলী (বাগেরহাট) এবং পটুয়াখালী বিমানবন্দর নিয়েও পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এসব বিমানবন্দর চালুর আগে যাত্রী চাহিদা, বাণিজ্যিক সম্ভাবনা এবং আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করা হবে।
বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক জানিয়েছেন, অব্যবহৃত বিমানবন্দরগুলো পুনরায় চালুর একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সরকারের অনুমোদন ও সম্ভাব্যতা মূল্যায়নের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাবের আশা:
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি বিমানবন্দর শুধু যাত্রী পরিবহনের মাধ্যম নয়; এটি স্থানীয় অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে ব্যবসা, হোটেল, পরিবহন, পর্যটন ও সেবাখাতে নতুন কর্মকাণ্ড তৈরি হয়। ফলে সরাসরি লাভ-ক্ষতির হিসাবের বাইরে এর বৃহত্তর অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তাদের মতে, শমশেরনগর বিমানবন্দর চালু হলে শ্রীমঙ্গল ও আশপাশের পর্যটন এলাকায় যাতায়াত সহজ হবে। ঈশ্বরদী বিমানবন্দর সচল হলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সংশ্লিষ্ট বিদেশি বিশেষজ্ঞদের যাতায়াত সুবিধা বাড়বে। একইভাবে লালমনিরহাট ও ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর চালু হলে উত্তরাঞ্চলের মানুষের সময় ও ভ্রমণ ব্যয় কমবে।
বর্তমানে দেশে তিনটি আন্তর্জাতিক ও পাঁচটি অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর চালু রয়েছে। বন্ধ বিমানবন্দরগুলো পুনরায় সচল করা গেলে দেশের আঞ্চলিক বিমান যোগাযোগে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের আশা, দীর্ঘদিন নীরব থাকা রানওয়েগুলোতে আবারও বিমান উড়তে শুরু করলে তার সুফল পাবে স্থানীয় জনগণ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামগ্রিক অর্থনীতি।