নিজস্ব প্রতিবেদক : গণমাধ্যমে সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, পক্ষপাত বা নিজস্ব চিন্তাধারা চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করেছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা মেইলের নির্বাহী সম্পাদক হারুন জামিল। তিনি বলেন, পাঠক সংবাদপত্রকে রাজনৈতিক লিফলেট হিসেবে দেখতে চায় না; তারা নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য চায়। কিন্তু সংবাদ উপস্থাপনের ক্ষেত্রে যখন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত অবস্থান বা মতাদর্শ প্রাধান্য পায়, তখন গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের বিশ্বাস কমে যায় এবং তারা বিকল্প হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
রোববার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের আব্দুস সালাম হলে সেন্টার ফর মিডিয়া, ইনফরমেশন অ্যান্ড পাবলিক পলিসির উদ্যোগে আয়োজিত ‘তথ্য ও সম্প্রচার খাতের সংস্কার: একটি জনমুখী ও সংস্কারমূলক রোডম্যাপ’ শীর্ষক সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
হারুন জামিল বলেন, স্বাধীনতার পর গত ৫৫-৫৬ বছরে এত বিপুল সংখ্যক সাংবাদিককে একসঙ্গে কারাগারে যেতে হয়েছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা তৈরি হওয়া। গণমাধ্যমের মূল কাজ সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করা নয়, বরং সমাজের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে মানুষকে সঠিক তথ্য দিয়ে সচেতন করা। তবে বর্তমান ডিজিটাল যুগে অনেক সময় মুনাফাকেন্দ্রিক সাংবাদিকতা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহারের ফলে সমাজে মেরুকরণ বা বিভাজন তৈরি হওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
তিনি আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কখনোই মূলধারার গণমাধ্যমের বিকল্প হতে পারে না। কারণ সংবাদপত্র ও পেশাদার গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের আগে বিভিন্ন স্তরে যাচাই-বাছাই, সম্পাদনা ও গেটকিপিং প্রক্রিয়া থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই নিয়ন্ত্রণ বা চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স নেই। ফলে যে কেউ যাচাই ছাড়াই যেকোনো তথ্য প্রকাশ করতে পারে, যা সামাজিক অস্থিরতা ও বিভ্রান্তি বাড়ায়।
বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যম— বিশেষ করে বিবিসি ও ওয়াশিংটন পোস্ট— দীর্ঘদিন ধরে মানুষের আস্থা ধরে রাখতে পেরেছে মূলত তাদের পেশাদারত্ব ও নিরপেক্ষতার কারণে। একটি সংবাদে সব পক্ষের বক্তব্য তুলে ধরা এবং তথ্যনির্ভর উপস্থাপনাই গণমাধ্যমের শক্তি। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে প্রায়ই সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত চিন্তা-চেতনা সংবাদে প্রতিফলিত হয়, যা গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সাবেক সাংবাদিক ও কনটেন্ট নির্মাতা নতুন ধরনের মতামতনির্ভর প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছেন। তারা টকশো বিশ্লেষক বা কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখছেন। তবে মূলধারার গণমাধ্যমের দায়িত্ব ও পেশাগত মানদণ্ডের বিকল্প কোনো প্ল্যাটফর্ম হতে পারে না।
হারুন জামিল বলেন, রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করা অবশ্যই সাংবাদিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব সব সময় সমানভাবে পালন করতে হবে। তিনি অভিযোগ করেন, গত ১৬ বছরে দেশে যখন গণতান্ত্রিক ও বিচারিক নানা সংকট তৈরি হয়েছে, তখন অনেক গণমাধ্যম ও সাংবাদিক সেই প্রশ্নগুলো যথাযথভাবে তোলেননি। ফলে সাংবাদিকতার নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দেশের পাঠক কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের সংবাদপত্র খোঁজেন না; তারা সত্য ও নির্ভুল তথ্য খোঁজেন। যখন সংবাদে বিকৃতি ঘটে বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ন্যারেটিভ তৈরি করা হয়, তখন পাঠক ক্ষুব্ধ হন এবং গণমাধ্যমের প্রতি আস্থা হারান। অনেক সময় সংবাদপত্র নিজেদের চিন্তাধারাকে জনগণের মতামত হিসেবে উপস্থাপন করে, যা সাংবাদিকতার মৌলিক নীতির পরিপন্থি।
গণমাধ্যমের প্রতি আস্থা পুনরুদ্ধারে পেশাদার সাংবাদিকদের নেতৃত্বে সংবাদকক্ষ পরিচালনার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, প্রকৃত সংবাদকর্মীদের মূল্যায়ন করতে হবে এবং গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ গেটকিপিং পর্যায়ে দক্ষ ও পেশাদার সাংবাদিকদের দায়িত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে পাঠকদেরও গণমাধ্যমকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার আহ্বান জানাই।
তার মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর সংবাদ দ্রুত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, ফলে গণমাধ্যমও আগের তুলনায় আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল হতে বাধ্য হচ্ছে।
তিনি বলেন, পাঠক, দর্শক ও শ্রোতারা যত বেশি প্রশ্ন করবেন এবং সংবাদমাধ্যমের ভুল ধরিয়ে দেবেন, তত দ্রুত সাংবাদিকতার মানোন্নয়ন সম্ভব হবে এবং গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের হারানো আস্থা ফিরে আসবে।