নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী জোটের সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে তার মন্তব্যকে ‘অসত্য’ আখ্যা দিয়ে তা কার্যবিবরণী থেকে এক্সপাঞ্জ (বাদ) দেওয়ার দাবি জানায় সরকারি দল বিএনপি।
এ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে তীব্র বাক্যবিনিময় ও হট্টগোলের ঘটনা ঘটে।
রবিবার ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে এনসিপির সংসদ সদস্য হান্নান মাসউদ বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বর্তমান সরকারের আকাঙ্ক্ষার দলিল হলেও বাস্তবতার সঙ্গে এর অনেক ব্যবধান রয়েছে। রপ্তানি প্রবৃদ্ধি, রাজস্ব আদায়, বাজেট ঘাটতি এবং ব্যাংক খাত থেকে ঋণ গ্রহণের সম্ভাবনা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
করমুক্ত আয়সীমা সামান্য বাড়ানো এবং খাদ্য নিরাপত্তা ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়েও সমালোচনা করেন তিনি। একই সঙ্গে সীমান্ত হত্যা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মব কালচার, ধর্ষণ ও ডাকাতির ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বক্তব্যের এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতার বিভিন্ন বক্তব্যের সমালোচনা করেন হান্নান মাসউদ। মুহূর্তেই সংসদে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
সরকারি দলের সদস্যরা তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং হট্টগোল শুরু করেন।
এ সময় ফ্লোর নেন বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদিন ফারুক। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সংসদকে কার্যকর রাখতে সব দলের মধ্যে একটি বোঝাপড়া রয়েছে। এখানে এমন কোনো বক্তব্য দেওয়া হবে না, যা অসত্য বা কারো সম্মানহানিকর। সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে দেওয়া বক্তব্যে তারা ক্ষুব্ধ বলে জানান এবং সংশ্লিষ্ট অংশ কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জানান।
জবাবে বিরোধী দলের চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, কোনো বক্তব্যকে অসত্য দাবি করলে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো অংশটি ভুল, তা উল্লেখ করতে হবে। সংসদ নেতার সমালোচনা করার অধিকার বিরোধী দলের রয়েছে এবং গণতান্ত্রিক চর্চার স্বার্থে এ অধিকারকে সম্মান করতে হবে।
পরে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, হান্নান মাসউদ তার বক্তব্যে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অসত্য তথ্য উপস্থাপন করেছেন। বিতর্কিত অংশ কার্যবিবরণী থেকে এক্সপাঞ্জ করার জন্য স্পিকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
এ সময় অধিবেশন কক্ষে হট্টগোল শুরু হলে ডেপুটি স্পিকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। সংসদ সদস্য হান্নান মাসউদ বারবার কথা বলতে চাইলে তাকে উদ্দেশ করে কায়সার কামাল বলেন, আপনার সময় শেষ। দয়া করে আসনে বসুন। এটা শাহবাগ চত্বর নয়, জাতীয় সংসদ।
ডেপুটি স্পিকারের এ মন্তব্যের পর বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সংসদের ভেতরে সংসদীয় রীতি ও শালীনতা বজায় রাখা প্রয়োজন। বাইরের রাজনৈতিক বক্তব্যের জবাব বাইরে দেওয়া উচিত এবং সংসদে সত্য-অসত্য নিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে জড়ানো সবার জন্য বিব্রতকর হতে পারে। বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কারো সম্মানহানি না করে পুরো বিতর্ক এড়িয়ে যাওয়াই উত্তম হতে পারে।
শেষে ডেপুটি স্পিকার বলেন, সংসদীয় বিধি-বিধান ও প্রচলিত রীতিনীতি অনুযায়ী বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এর আগে প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করে হান্নান মাসউদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী আজ সংসদে নেই। তিনি বিভিন্ন ভাষণে বিরোধী দল সম্পর্কে অসত্য তথ্য দিচ্ছেন। তিনি বলেছেন, ‘বিরোধী দল মদের দাম বা সিগারেটের দাম বাড়ানোর কারণে মিছিল করছে।’ এ ধরনের অসত্য তথ্য দিয়ে বক্তব্য দিলে আমরা খুবই আশাহত হই। ঋণ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী যখন বলেন, ‘আপনারা সবাই জমিদার, যারা ঋণ নেননি’, তখন তিনি মূলত ঋণখেলাপিদের উৎসাহিত করছেন। আমরা এমন সংসদ চাই না, যেখানে প্রধানমন্ত্রী অসত্য তথ্য দেন।
দেশে চলমান ‘মব কালচার’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এই সংসদ সদস্য বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাসসে মব সৃষ্টি করে কর্মকর্তাদের বের করে দেওয়া হচ্ছে। সরকার ক্ষমতায় থেকে কেন মবের আশ্রয় নিতে হচ্ছে? নিয়োগ বাতিল করলেই তো হতো।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে হান্নান মাসউদ বলেন, একজন শিবির নেতার প্রেমঘটিত বিষয় নিয়ে সংসদে বিবৃতি দেওয়া হলেও তার নিজের আসনে মা-মেয়েকে ধর্ষণের ঘটনায় তিনি কোনো বিবৃতি দেননি, কোনো কথাও বলেননি। গত চার মাসে ১১৮ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং ১৭ জনকে হত্যা করা হয়েছে।
সীমান্ত হত্যা প্রসঙ্গে এই সংসদ সদস্য বলেন, আমরা এমন এক সংসদে আছি, যেখানে ফ্যাসিবাদকে উৎখাত করে এসেছি। কিন্তু সীমান্ত হত্যা নিয়ে যেভাবে ভারতের পক্ষে কথা বলা হচ্ছে, যেভাবে আওয়ামী লীগ সরকার ও ফ্যাসিবাদী সরকার বলত, ঠিক একইভাবে এই সংসদের বিভিন্ন মন্ত্রীরা ভারতীয় ভাষায় কথা বলছেন। ফ্যাসিবাদী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেভাবে বক্তব্য দিতেন, আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও একইভাবে বক্তব্য দিচ্ছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, সব সীমান্ত হত্যাকে হত্যা বলা যাবে না। আমরা বলছি, প্রত্যেকটি সীমান্ত হত্যাই হত্যা এবং তা আমাদের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি।