এইচ এম প্রফুল্ল, খাগড়াছড়ি : মানুষ তাঁর সৎ কর্ম, ত্যাগ এবং ভালোবাসার মাধ্যমে মৃত্যুর পরেও যুগ যুগ ধরে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকেন| মহৎ মানুষেরা মরেও অমর হয়| কিন্তু জীবিত মানুষ কখনোই মরে না| যে মানুষটি বেঁচে আছেন, সমাজের বুকে হেঁটে চলেছেন তাঁকে একটি সরকারি সনদে ‘মৃত’ ঘোষণা করে সাধারন মানষের দীর্ঘ বছরের এমন ধারনাকে পাল্টে দিয়েছেন মাটিরাঙ্গার সাবেক উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহমুদুর রহমান ও ইউনিয়ন পরিষদ সচিব মো. ওসমান আলী|
দায়িত্বশীল সরকারী কর্মকর্তার এমন ভুলের খেসারত হিসেবে কেটে দেওয়া হয়েছে ওই বৃদ্ধের সরকারি ‘বয়স্ক ভাতার’ কার্ডটি| ফলে সরকারী ভাতার টাকা না পেয়ে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক বরাবরের আবেদন করেছেন ভুক্তভোগী|
চাঞ্চল্যকর ও হৃদয়বিদারক এই ঘটনাটি ঘটেছে পার্বত্য খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার তবলছড়ি ইউনিয়নে| ভুক্তভোগী ওই বৃদ্ধের নাম মো. রুহুল আমিন| তিনি তবলছড়ির বড়বিল মুসলিমপাড়া গ্রামের বাসিন্দা|
ভুক্তভোগীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, বিগত কয়েক বছর ধরে নিয়মিত সরকারি বয়স্ক ভাতা পেয়ে আসছিলেন| কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে তার মুঠোফোনে ভাতার টাকা আসছিল না| ভাতার টাকা না আসার কারণ জানতে সম্প্রতি উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে জানতে পারেন স্মারক নং-৪৬.০০.৪৬৭০.০৭৬.১৬.০০৬.২১, তারিখ-১১/১/২০২৬ মুলে তাকে ২০২৪ সালে মৃত্যু দেখানো হয়েছে|
নিজের মৃত্যুর কথা শুনে আকাশ ভেঙে পড়ে বৃদ্ধের মাথায়| তাকে জানান, সরকারি দাপ্তরিক নথিতে তিনি অনেক আগেই ‘মৃত’| ইউনিয়ন পরিষদ প্রদত্ত ‘মৃত্যু নিবন্ধন সংক্রান্ত প্রত্যয়নপত্র’র ওপর ভিত্তি করে সমাজসেবা অধিদপ্তর তার বয়স্ক ভাতার কার্ডটি স্থায়ীভাবে বাতিল করে দিয়েছে|
সরকারী ভাবে কাগজে-কলমে ‘মৃত’ হয়ে যাওয়া ওই বৃদ্ধ মো. রুহুল আমিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি জীবিত মানুষের সামনে হেঁটে বেড়াচ্ছি, অথচ সরকারের বড় কর্মকর্তা লিখে দিলেন আমি নাকি মারা গেছি! এই ভাতার টাকা দিয়ে আমার ওষুধের খরচ চলত| এখন ভাতা তো বন্ধই হলো, উল্টো আমি যে বেঁচে আছি সেটা প্রমাণ করতে বুড়ো বয়সে টেবিলে টেবিলে ঘুরতে হচ্ছে| এর চেয়ে মরে যাওয়াও ভালো ছিল|
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, তবলছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মো. ওসমান আলী ও চারজন ইউপি মেম্বার যথাক্রমে মো. আব্দুল মজিদ, জমিলি বেগম, মো. বেলাল হোসেন ও মর্জিনা বেগম ওই মৃত্যু নিবন্ধন সংক্রান্ত প্রত্যয়নপত্রে স্বাক্ষর করেন| তাদের গাফেলতির কারণেই কপাল পোড়ে জীবিত বৃদ্ধ মো. রুহুল আমিনের|
এবিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় এইচ এম হেলাল উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, যে মানুষটি প্রতিদিন মসজিদে নামাজ পড়তে যান, দোকানে আসেন সে মানুষটা মৃত ঘোষনা করা এক ধরেন চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা| তিনি এঘটনায় দোষী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে কোনো জীবিত মানুষকে এভাবে হয়রানির শিকার হতে না হয়|
নাম প্রকাশ না করার শর্তের একাধিক বাসিন্দা বলেন, তবলছড়ি ইউনিয়ন পরিষদ সচিব মো. ওসমান আলীর দৌরাত্বের কাছে সাধারন মানুষ অসহায়| তিনি গত দুই বছরে তবলছড়িতে নিজেকে মহারথীতে পরিনত হয়েছেন| শুধুমাত্র জীবিত ব্যাক্তিকে মৃত ঘোষনাই নয়, তার বিরুদ্ধে সরকারী উন্নয়ন বরাদ্দে নয়ছয়েরও অভিযোগ করেন তারা| তারা বলেন, তার অনিয়মের তদন্ত করা হলে ‘কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেড়িয়ে আসবে’|
এ বিষয়ে তবলছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মো. ওসমান আলী বলেন,
বিগত ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫, সমাজ সেবা থেকে বয়স্ক ভাতাভোগী ৩৫ জন মৃত ব্যক্তির একটি তালিকা প্রতিস্থাপন করার জন্য ইউনিয়ন পরিষদে পাঠানো হয়| সেই তালিকা অনুযায়ী গ্রাম পুলিশ তদন্ত করে রিপোর্ট দিলে আমি মৃত্যুর সনদ তৈরী করি| খাগড়াছড়ি জেলা সমাজ সেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আবু আবদুল্লাহ মোঃ ওয়ালী উল্লাহ বলেন, সমাজ সেবা অধিদপ্তর কারো মৃত্যুর সনদ দেয় না| বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে|
খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, কার গাফেলতিতে এমন ঘটনা ঘটেছে তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে| জীবিত মো. রুহুল আমিনকে মৃত দেখিয়ে সনদ দেওয়ার ঘটনা এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে| এলাকাবাসী এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিচার চান|