নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের চার বিভাগে আগামী কয়েক দিনে স্বল্পমেয়াদি ও আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। আবহাওয়া সংস্থা এবং বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী—চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলায় নদী-সংলগ্ন নিচু এলাকা এবং নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মূলত দেশের অভ্যন্তরে ও ভারতের উজানে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের কারণেই এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে।
মঙ্গলবার বন্দর নগরী চট্টগ্রামে ৩৯৪ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ একেএম নাজমুল হক বলেন, ৪৩ বছরের ইতিহাসে গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে রেকর্ড বৃষ্টিপাত হয়েছে।
আবহাওয়া দপ্তরের গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় দেওয়া আগের ২৪ ঘণ্টার তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, সারা দেশেই কমবেশি বৃষ্টি হলেও চট্টগ্রাম বিভাগেই সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে। চট্টগ্রাম ছাড়াও বান্দরবানে ১৭৬, পটুয়াখালীর খেপুপাড়ায় ১০৬, সীতাকুণ্ডে ১৭০, নোয়াখালীর হাতিয়ায় ১৪৩, কক্সবাজারের টেকনাফে ৯৪ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এদিন রাজধানীতে ৪৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়।
এদিকে, আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আরো দুদিন এই ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। পাহাড়ধসের ঝুঁকির কারণে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার মাইকিং করছে জেলা প্রশাসন।
এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি সামগ্রিকভাবে বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও অভ্যন্তরীণ ও উজানের বৃষ্টিপাত পরিস্থিতিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। গত একদিনে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে দেশের সর্বোচ্চ ২৫৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা অতি ভারী বর্ষণের রূপ নিয়েছে। এছাড়া সিলেট ও বরিশাল বিভাগ এবং ভারতের মেঘালয় ও ত্রিপুরা প্রদেশেও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত পরিলক্ষিত হয়েছে। ভারতের ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ড এলাকায় অবস্থানরত মৌসুমি নিম্নচাপটি দুর্বল হয়ে বর্তমানে সুস্পষ্ট লঘুচাপ আকারে পূর্ব মধ্যপ্রদেশে অবস্থান করছে। এর প্রভাবে আগামী চারদিন দেশের উল্লিখিত চার বিভাগ এবং তৎসংলগ্ন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম ও মেঘালয় প্রদেশে ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, আগামী তিন থেকে চার দিন ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় দেশের নদীগুলোর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। এর মধ্যে গোমতী, মুহরী, ফেনী, সেলোনিয়া, হালদা, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আগামী তিন দিন আরো দ্রুত বাড়বে। ফলে আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বান্দরবান, কক্সবাজার, ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি জেলার কিছু স্থানে স্বল্পমেয়াদি বন্যা সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী জেলার নিম্নাঞ্চলও সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে।
সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় কমলেও আগামী তিন দিন তা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে সিলেট ও সুনামগঞ্জে সতর্কসীমায় পৌঁছাতে পারে। অন্যদিকে মনু, ধলাই, খোয়াই ও কংস নদীর পানি কমলেও সারিগোয়াইন, সোমেশ্বরী, যাদুকাটা ও ভুগাই নদীর পানি বেড়েছে। একই সময়ে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার নদীগুলোর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে, যার ফলে নদী-সংলগ্ন নিচু এলাকায় আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে।
তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় হ্রাস পেলেও তা আগামী তিন দিন দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। এর মধ্যে আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তিস্তা নদী বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নীলফামারী ও লালমনিরহাটের নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। এছাড়া পরবর্তী ৭২ ঘণ্টায় ধরলা ও দুধকুমার নদী কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে সতর্কসীমা ছুঁতে পারে। ব্রহ্মপুত্র-যমুনার পানি আগামী তিন দিন কমলেও পরবর্তী দুদিন বৃদ্ধি পেতে পারে, তবে তা বিপৎসীমার নিচেই থাকবে। এই অববাহিকাগুলোয় আপাতত বন্যার কোনো ঝুঁকি নেই।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান জানিয়েছেন, আগামী তিন থেকে চার দিন ভারী বৃষ্টির কারণে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা কম। তিন থেকে চার দিন পর বৃষ্টির মাত্রা কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে নদ-নদীর পানিও কমতে শুরু করবে। ফলে এখনই বন্যা স্থায়ী রূপ নেওয়ার শঙ্কা নেই।
ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস:
মঙ্গলবার আবহাওয়া দপ্তরের পরিচালকের পক্ষে আবহাওয়াবিদ একেএম নাজমুল হক স্বাক্ষরিত ভারী বৃষ্টিপাতের সতর্কবার্তায় বলা হয়, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে মঙ্গলবার বেলা ৩টা থেকে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টায় খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, রংপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে।
নিম্নচাপের প্রভাব কেটে গেলেও উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় বায়ু চাপের তারতম্যের আধিক্য বিরাজ করছে। সমুদ্রবন্দরসমূহ, উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার ওপর দিয়ে ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। এ জন্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরসমূহকে বারবার তিন নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।