নিজস্ব প্রতিবেদক : বিগত ১৭ বছরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়া রাষ্ট্রীয় কাঠামো পুনর্গঠনই সরকারের গত পাঁচ মাসে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার কোনোভাবেই গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেবে না এবং এ ধরনের অভিযোগের তদন্তে সরকার কঠোর অবস্থান নেবে।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে তথ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে ডা. জাহেদ উর রহমান এসব কথা বলেন।
সরকারের পাঁচ মাসের কার্যক্রম ও প্রধান চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার এমন একটি প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে কাজ করছে, যা দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের যেসব প্রতিষ্ঠান স্বাধীনভাবে কাজ করার কথা, সেগুলোর অনেকগুলোর কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ভেঙে পড়া কাঠামো পুনর্গঠন করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা বলেন, পুলিশ বাহিনী নির্বাচিত সরকারের অধীনে কাজ করার সুযোগ পেলেও জনগণের আস্থা পুরোপুরি ফিরে আসেনি। অতীতের নানা ঘটনার কারণে জনগণের মধ্যে যে মানসিক আঘাত বা ট্রমা তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে।
একইসঙ্গে পুলিশকে দায়িত্ব পালনের সুযোগও দিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা ও বিভিন্ন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গণমাধ্যম এসব বিষয় তুলে ধরবে, সংশ্লিষ্টরা ব্যাখ্যা দেবেন এবং প্রয়োজন হলে সরকার ব্যবস্থা নেবে। এসব প্রক্রিয়াকেই তিনি গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, জনগণ বর্তমান সরকারের ওপর বড় ধরনের প্রত্যাশা নিয়ে ভোট দিয়েছে। ফলে প্রত্যাশার চাপও সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। জনগণকে কিছুটা ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার সেই প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টা করছে।
বাগেরহাটের মোংলায় কোস্টগার্ড পরিচয়ে এক যুবককে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ এবং মানবাধিকার সংগঠনের গুমের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, বিষয়টি সরকার অস্বীকার করছে না। অভিযোগটি যাচাই করা হবে এবং তিনি ব্যক্তিগতভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার অনুরোধ জানাবেন। বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেও অতীতে গুমের শিকার ছিলেন। তাই সরকার গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেবে না।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা বলেন, একটি রাষ্ট্র যদি কাউকে গুম করে বা বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করে, তাহলে সেটি আর প্রকৃত অর্থে রাষ্ট্র থাকে না। তার মতে, রাষ্ট্রের কাজ আইনের শাসন নিশ্চিত করা, আইনবহির্ভূতভাবে কাউকে হত্যা বা গুম করা নয়।
তথ্য কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও মানবাধিকার কমিশনের মতো জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনে সরকারের অগ্রাধিকার কম কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এগুলো সরকারের অগ্রাধিকারের মধ্যেই রয়েছে। তথ্য কমিশনের জন্য আইনে নির্ধারিত নির্বাচন কমিটি ইতোমধ্যে গঠন করা হয়েছে এবং খুব শিগগিরই কমিশন পুনর্গঠন হবে। একইভাবে দুদক পুনর্গঠনের কাজও এগিয়ে চলছে। মানবাধিকার কমিশনের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া শেষ হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জুলাইয়ের সহিংসতার বিচার হবে:
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে পুলিশের গুলিতে নিহতদের ঘটনায় দায়ীদের বিচার নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, সরকার মূলত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনতে চায়।
তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধ বিচারের মতো ক্ষেত্রেও সবাইকে নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যক্তিদের বিচার করা হয়েছে। একই নীতিতে যারা নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে বিচার হবে। শুধু চাকরি থেকে অপসারণ নয়, আইনি বিচারও হবে।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা বলেন, পুরো পুলিশ বাহিনীকে অতীতের ঘটনার জন্য দায়ী করা উচিত নয়। যাদের ব্যক্তিগত অপরাধ রয়েছে, তাদের বিচার হবে। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনায় কার্যকর পুলিশ বাহিনী অপরিহার্য। তাই পুলিশকে দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান তিনি।