শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৬ শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৬ সফর, ১৪৪৮ হিজরি

জাতীয় দলের স্বপ্ন দেখা ডেভিড ইমন যেভাবে হলেন সন্ত্রাসী

নিজস্ব প্রতিবেদক : একটা সময় হাতে ছিল ক্রিকেট বল, চোখে ছিল জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন। চট্টগ্রামের ক্রিকেটাঙ্গনে সম্ভাবনাময় বাঁহাতি ‘চায়নাম্যান’ স্পিনার হিসেবে পরিচিত ছিলেন মোবারক হোসেন ইমন। কিন্তু সেই স্বপ্ন শেশ পর্যন্ত আর পূরণ হয়নি। কয়েক বছরের মধ্যে ক্রিকেট ছেড়ে জড়িয়ে পড়েন অপরাধ জগতে। সময়ের ব্যবধানে ‘ডেভিড ইমন’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন চট্টগ্রামের অন্যতম আলোচিত শীর্ষ এই সন্ত্রাসী।

বুধবার ভোরে যশোর সদর উপজেলার ঝুমঝুমপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে তিন সহযোগীসহ ডেভিড ইমনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), কোতোয়ালি মডেল থানা ও যশোর জেলা পুলিশের যৌথ অভিযানে দীর্ঘদিনের নজরদারির পর তার অবস্থান নিশ্চিত করে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়।

ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে অন্তত ১৫টি মামলা রয়েছে উল্লেখ করে পুলিশ বলেন, এর মধ্যে রয়েছে ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকার আলোচিত জোড়া হত্যা, ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যা, হাটহাজারীর জোড়া হত্যা, চান্দগাঁওয়ের আফতাব হত্যা এবং চন্দনপুরা এলাকায় একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নথিতে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট আনিস ও মোহাম্মদ হাসান হত্যা মামলায় প্রথম তার নাম উঠে আসে। এরপর একের পর এক আলোচিত হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন তিনি।

পুলিশের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রামের অপরাধ জগতে দ্রুত উত্থান ঘটে ডেভিড ইমনের। ওই সময় বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের গ্রুপে যোগ দেন তিনি। দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ডের কারণে অল্প সময়েই গ্রুপটির অন্যতম সক্রিয় সদস্যে পরিণত হন। ছোট সাজ্জাদ ওরফে সাজ্জাদ হোসেন কারাগারে যাওয়ার পর মাঠপর্যায়ের সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বও নেন তিনি ও মোহাম্মদ রায়হান আলম।

বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ, পতেঙ্গা, চান্দগাঁওসহ চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকায় এবং রাউজান, হাটহাজারী ও ফটিকছড়িতে গ্রুপটির তৎপরতার তথ্য রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশের মতে, অস্ত্র ব্যবহারে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন ডেভিড ইমন। ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া ১৫ থেকে ২০টি অস্ত্র হাতে তার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্রসহ তার একাধিক ছবিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে রয়েছে। এছাড়া বাকলিয়ার জোড়া হত্যা মামলায় মোটরসাইকেল ভাড়া ও হামলাকারীদের সমন্বয়ের দায়িত্বও তার ওপর ছিল বলে অভিযোগ পুলিশের।

এর আগে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বায়েজিদ থানার একটি দস্যুতা মামলায় কক্সবাজার থেকে গ্রেফতার হয়েছিলেন ইমন। তবে মাত্র ২২ দিনের মাথায় জামিনে মুক্তি পান। এরপর তার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আরও বিস্তৃত হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

অথচ ছোটবেলায় তার পরিচয় ছিল এক সম্ভাবনাময় ক্রিকেটার হিসেবে। স্থানীয়দের ভাষ্য, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনার পাশাপাশি ক্রিকেট ছিল তার সবচেয়ে বড় নেশা। এলাকার মাঠে খেলতে খেলতেই প্রতিভার পরিচয় দেন। পরে ২০১৯ সালে চট্টগ্রাম শহরের ব্রাদার্স ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি হন। বাকলিয়া স্টেডিয়াম ও কাজীর দেউড়ি এলাকায় নিয়মিত অনুশীলন করতেন।

বাঁহাতি ‘চায়নাম্যান’ স্পিনার হিসেবে দ্রুত পরিচিতি পান তিনি। ভারতীয় স্পিনার কুলদীপ যাদবকে অনুসরণ করতেন এবং একদিন জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপানোর স্বপ্ন দেখতেন।

ব্রাদার্স ক্রিকেট একাডেমির কোচ আমিনুল হক বলেন, ‘ইমন খুবই শান্ত-স্বভাবের ছেলে ছিল। নিয়মিত অনুশীলন করত, বেশি কথাও বলত না। করোনার পর থেকে তাকে আর মাঠে দেখিনি। পরে গণমাধ্যমে ‌‘ডেভিড ইমন’ নামে সংবাদ দেখে জানতে পারি, সেই ছেলেটিই মোবারক হোসেন ইমন।’

জাতীয় দলের স্বপ্ন দেখা সেই তরুণ শেষ পর্যন্ত অপরাধের অন্ধকার জগতে গা ভাসান। মোবারক হোসেন ইমন এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে পরিচিত চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘ডেভিড ইমন’ হিসেবে।