মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৩১ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৩ রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

ফেনীতে বালু উত্তোলন নিয়ে হামলা-পাল্টা হামলা

ফেনী প্রতিনিধি : ফেনীর ছাগলনাইয়ায় ফেনী নদীজুড়ে প্রকাশ্যে চলছে অবৈধ বালু উত্তোলন। শুধু নদী থেকেই নয়, প্রশাসনের জব্দ করা বালুও বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে।
কোটি টাকার এই অবৈধ বাণিজ্যকে ঘিরে এলাকায় তৈরি হয়েছে আধিপত্যের রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্ব। ঘটছে হামলা-পাল্টা হামলা, সংঘর্ষ, গোলাগুলি-এমনকি সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন সাংবাদিকও।

প্রশাসনের দাবি, ফেনীর কোনো নদী থেকেই বর্তমানে বালু উত্তোলনের অনুমতি নেই। কিন্তু বাস্তবে দিনের আলোতেই ড্রেজার ও শ্যালো মেশিন বসিয়ে নদীর তলদেশ কেটে বালু তোলা হচ্ছে।
শুধু নদী নয়, কেটে ফেলা হচ্ছে নদীতীরের চর ও আশপাশের ফসলি জমিও। ফলে নদীভাঙন আরও তীব্র হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করলেই প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। তাদের দাবি, অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে বিএনপি নেতা আলমগীর সিদ্দিকী ও তার অনুসারীরা জড়িত। তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদেই কোটি টাকার এই অবৈধ বাণিজ্য পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ।

ঘোপাল ইউনিয়নের লাঙ্গলমোড়া এলাকার বাসিন্দা কবির আহম্মদ বলেন, দিনদুপুরে ফসলি জমি কেটে নিয়ে যায় বালুদস্যুরা। প্রতিবাদ করলেই মেরে ফেলার হুমকি দেয়।

সালেহা বেগম বলেন, অনেক দাবি-দাওয়ার পর সরকার নদীভাঙন ঠেকাতে ব্লক বসিয়েছিল। এখন যেভাবে বালু তোলা হচ্ছে, তাতে সেই ব্লকও নদীতে তলিয়ে যাচ্ছে।

শুভপুর সোনাপুর গ্রামের বাসিন্দা আফিয়া বেগমের ভাষায়, আমার বসতঘর নদীতে বিলীন হয়েছে। বালুদস্যুদের থামানো না গেলে ফসলি জমিটাও হারাতে হবে।

অবৈধ বালু উত্তোলনের চিত্র ধারণ করতে গিয়ে সম্প্রতি হামলার শিকার হন মোহনা টেলিভিশনের স্থানীয় প্রতিনিধি নিজাম উদ্দিন চৌধুরী সজীব। অভিযোগ, আগে থেকেই ওত পেতে থাকা দুর্বৃত্তরা তার ওপর হামলা চালায়। তাকে মারধরের পাশাপাশি ক্যামেরা, মোবাইল ফোন ও সংবাদ সংগ্রহের সরঞ্জাম নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।

নিজাম উদ্দিন চৌধুরী সজীব বলেন, আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যেই হামলা করা হয়েছিল।

বালুর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব শুধু সাংবাদিকের ওপর হামলায় সীমাবদ্ধ নয়। একই রাজনৈতিক দলের দুটি পক্ষও মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। সম্প্রতি সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনায় কয়েকজন আহত হন। গুলিবিদ্ধ হন স্থানীয় যুবদল নেতা টিপু।

টিপুর অভিযোগ, অবৈধ বালু বিক্রিতে বাধা দেওয়ায় আলমগীর সিদ্দিকী ও তার সহযোগীরা আমাকে ডেকে নিয়ে হত্যার চেষ্টা করে।

ফেনী নদীর এ অংশে নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করায় দুই বছর আগে সরকার বালুমহালের ইজারা বাতিল করে। ফলে বর্তমানে নদী থেকে যেকোনো ধরনের বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ অবৈধ।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী চক্রটি প্রকাশ্যেই নদী থেকে বালু তুলছে। এমনকি প্রশাসনের জব্দ করা বিপুল পরিমাণ বালুও বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলনের কারণে ছাগলনাইয়া অংশে নদীভাঙন আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও গ্রামীণ সড়ক।

ফেনীর জেলা প্রশাসক মুনিরা হক বলেন, ফেনীর কোনো নদী থেকেই বর্তমানে বালু উত্তোলনের অনুমতি নেই। সব বালুমহালের ইজারা বন্ধ রয়েছে।

এদিকে অভিযোগের ভিত্তিতে গত শুক্রবার রাজধানী ঢাকা থেকে অভিযুক্ত বিএনপি নেতা আলমগীর সিদ্দিকীকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।

গ্রেপ্তারের আগে তার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

স্থানীয় সংসদ সদস্য রফিকুল আলম মজনু বলেন, বর্তমানে ছাগলনাইয়ায় কোনো বালুমহালের ইজারা কার্যকর নেই। ফলে নদী থেকে বালু উত্তোলনের সব কার্যক্রমই অবৈধ। যারা এ কাজে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয়দের মতে, অবৈধ বালু উত্তোলনকে ঘিরে আধিপত্যের এই সংঘাত এখন শুধু নদী বা বালুমহালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব পড়ছে পুরো এলাকার আইনশৃঙ্খলা, জননিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।