মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২০ শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২০ সফর, ১৪৪৮ হিজরি

অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতির একাধিক আঘাত

ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব :

সরকার সুদের হার কমিয়েছে। হাইপাওয়ার্ড মানি সাপ্লাই বাড়িয়েছে-সরকার ইঞ্জেক্ট করছে আবার নাগরিকরাও নগদ টাকা হাতে রাখছেন। বন্যায় দ্রব্যমূল্য বেড়েছে। অর্থাৎ ইনফ্লেশরারি টুলসের কিছু সরকারের পলিসির সরাসরি প্রভাবে, কিছু ব্যাংকিং আস্থা কমে, আর কিছু ন্যাচারালি হয়েছে।

চলতি বছরের মে মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ১৬ মাসের সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ, জুনে কিছুটা কমে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমে আসে। এই মুহূর্তে বন্যাজনিত প্রভাবে জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি বাড়ার সম্ভাবনা আছে।

বাজেটে সরকারের মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ৭ দশমিক ৫ শতাংশ।

এরই মধ্যে সরকার পলিসি রেট (রেপো) শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কমিয়ে ১০ শতাংশ থেকে ৯ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়েছে। একই সঙ্গে স্ট্যান্ডার্ড লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (SLF) বা সুদের গড় উচ্চসীমা ১১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কমিয়ে ১১ শতাংশ করা হয়েছে। ব্যাংকিং ভাষায়, এটি ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমানো। অর্থাৎ সরকার টাকার সরবরাহ বাড়াতে চায়। সুদের উচ্চহার ও পলিসি রেট কমানোর ফলে মুদ্রার সরবরাহ বাড়বে, তবে এর সঙ্গে মূল্যস্ফীতির প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে।

বাস্তবে স্ট্যান্ডার্ড লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (SLF) বা সুদের গড় উচ্চসীমা ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ (চার্ট অনুযায়ী)। এদিকে সরকার কোনো মনিটারি পলিসি মডেলিং ছাড়াই এক দিনের নোটিসে স্প্রেডের লক্ষ্যমাত্রা ৪ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। অথচ বাস্তবে স্প্রেড ৫ দশমিক ৭২ শতাংশ।

স্প্রেড গণনার সময় সব ধরনের শ্রেণীকৃত ঋণের বিদ্যমান সুদের হার বিবেচনায় নেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে অনেক ঋণ থেকে আয় প্রায় শূন্য বা অনুল্লেখযোগ্য। আবার এসএমইসহ কিছু লেন্ডিং প্রোডাক্টে সুদের হার তুলনামূলক অনেক বেশি। তাই খাতভিত্তিক ও প্রোডাক্টভিত্তিক (যেমন—এসএমই, করপোরেট, পার্সোনাল লোন ইত্যাদি) স্প্রেডের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলে তা বাস্তবায়ন করা আরো সহজ হবে। সামগ্রিক (ওভারঅল) স্প্রেডের একক লক্ষ্যমাত্রা কার্যকরভাবে কাজ করছে না।

প্রশ্ন হচ্ছে, সুদের হার কমানোয় যে বাড়তি ঋণ চাহিদা তৈরি হবে, এই টাকা আসবে কোথা থেকে?

আরেকটি ঘটনা উল্লেখযোগ্য। নগদায়ন বাড়ছে। এটাও রিজার্ভ মানি। ব্যাংকের ওপর আস্থাহীনতায় নগদায়ন বাড়ছে। প্রায় ৪৯ শতাংশ হাজার কোটি টাকা নগদ টাকা বেড়েছে বা আমানত কমেছে। আবার নগদ টাকা রিজার্ভ মানি বলে, মানি মাল্টিপ্লাইয়ার ইফেক্টে মূল্যস্ফীতিবান্ধব।

আবার, সরকার নিজেও ব্যাংক থেকে টাকা ধার করা বাড়িয়েছে এবং দুর্বল ব্যাংকে তারল্য সরবরাহ বাড়াচ্ছে। একদিকে আমানত কমছে, কিন্তু মানি সরবরাহ বাড়ানোর এসব কৌশল আদতে ব্রড মানি বাড়ানোর যাবতীয় আয়োজন। ব্রড মানি বাড়ানোর সঙ্গে মূল্যস্ফীতির সম্পর্ক সরাসরি।

পাশাপাশি সরকার বন্ধ শিল্প-কারখানা সচলে ৬০ হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে, এর ১৯-২০ হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে সেন্ট্রাল ব্যাংকের রিজার্ভ মানি থেকে। এটি হাইপাওয়ার্ড মানি, যা মানি মাল্টিপ্লাই হয়ে ব্রড মানিতে কনভার্ট হলে অন্তত ১ লাখ কোটিতে যাবে, (সরকারের হিসাবে মানি মাল্টিপ্লায়ার ৫ দশমিক ২)। অর্থাৎ নতুন ১ লাখ কোটি যোগ হলেও মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে মূল্যস্ফীতিতে বাড়াবে, আজকেই প্রধানমন্ত্রী বলেছেন এই ২০ হাজার কোটি যাবে এই ডিসেম্বরের মধ্যে। আমরা আশা করেছিলাম, এ রকম প্রণোদনা রিজার্ভ মানি থেকে না হয়ে, বাজেট ফাইন্যান্সিং থেকে হবে, যা মূল্যস্ফীতি কন্ট্রিবিউশন কম হতো।

সদ্যবিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে রিজার্ভ মানির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ১ শতাংশ, যেখানে প্রক্ষেপণ ছিল ৮ দশমিক শূন্য শতাংশ। অর্থবছরের প্রথমার্ধে এ প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ২ শতাংশ, যা ৫ শতাংশ প্রক্ষেপণের তুলনায় অনেক বেশি। এর অন্যতম কারণ, রেকর্ড পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গড়তে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার নিট ক্রয়; যার আন-স্টেরিলাইজড অংশ বাজারে টাকার সরবরাহ বাড়িয়েছে। ফলে গত ছয় মাসে রিজার্ভ মানির প্রবৃদ্ধি প্রক্ষেপণের তুলনায় ৪ শতাংশ পয়েন্ট বেশি হয়েছে, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শেষ ছয় মাসে, ব্রড মানি ১০ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছিল। নতুন করে রিজার্ভ মানির বৃদ্ধি, রেপো বা পলিসি রেট, সুদের উচ্চহার কমানোয় ব্রড মানি বৃদ্ধির হার অনেক অনেক বাড়তে পারে-এসবের কোনোটাই মূল্যস্ফীতি কমানোর অনুকূল পলিসি নয়।

আরেকটা পয়েন্ট হচ্ছে, আগেরবার আমানতে সুদহার কমিয়ে তো ফল এলো না, পলিসিটা রিভাইস করতেন। আপনার সংকট আমানতে আস্থাহীনতা, নগদায়ন। আমানতে সুদ কিছু বাড়াতেন! (স্ট্যান্ডার্ড ডিপোজিট ফেসিলিটি বা এসডিএফ) বা আমানতে সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট বা শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বাড়াতেন এবার।

সরকার-নির্ধারিত ৪ শতাংশ ক্যাপ বিপরীতে ৫ দশমিক ৭২ শতাংশ গড় স্প্রেড; ৬১টির মধ্যে ৫৬টি ব্যাংক সীমার ওপরে। মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করলে প্রকৃত আমানত সুদহার হয় নেগেটিভ-২ দশমিক ৮ শতাংশ-অর্থাৎ ব্যাংকে টাকা রাখা মানেই ক্রয়ক্ষমতা হারানো, যা সঞ্চয়-প্রণোদনা ও দীর্ঘ মেয়াদে আমানত প্রবৃদ্ধির জন্য ক্ষতিকর। ব্যাংকে টাকা রাখলে টাকা কমে যাচ্ছে বছরে, এটি শূন্যের কাছাকাছি এনে, আমানতে আস্থা কীভাবে ফেরাবেন?

মুদ্রানীতি তো অর্থ বিজ্ঞান। সরকার কীভাবে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে আনবেন? নাকি বাজেটের এই টার্গেট নিছক একটা সংখ্যা মাত্র? পলিসি রেট/রেপো, এসএলএফ, এসডিএফ, স্প্রেড প্রতিটি মডেলিংভিত্তিক না করলে আমরা বুঝে নিই ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির টার্গেট দায়সারা! আপনি নিজেই এটি বিশ্বাস করেন না, আপনার লক্ষ্য বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বাড়ানো, যা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেবে। হতে পারে ব্যবসায়ীরা নিম্ন সুদের জন্য ক্রমাগত চাপ দিচ্ছেন। আওয়ামী লীগ আমলের মুদ্রানীতি ছিল ধারাবাহিক ব্যর্থতার খতিয়ান, ৬-৯ ইন্টারেস্ট রেট ক্যাপিং করে সস্তা ঋণ নিয়ে বেশুমার অর্থ পাচারের ঐতিহাসিক দায় নেওয়ার দিকে নির্বাচিত সরকার কেন হাঁটবে?

একমাত্র ফেয়ার পয়েন্ট হচ্ছে, অর্থনীতি স্থবির, তাই সুদহার কমিয়ে ব্যবসায় ঋণপ্রবাহ বাড়ানো গেলে কর্ম তৈরি হবে। কিন্তু এখানে মূল বাধা সরকারের ঋণ। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি জুন ২০২৫-এ ৬ দশমিক ৫ থেকে নেমে মার্চ ২০২৬-এ ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ, স্বাধীনতার পর এটি সর্বনিম্ন। জুন ২০২৬-এ আনুমানিক ৫ দশমিক ৫ শতাংশ (প্রক্ষেপণ ছিল ৮ দশমিক ৫ শতাংশ)। বিপরীতে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি অস্বাভাবিক, ডিসেম্বর ২০২৫-এ ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং জুন ২০২৬-এ ২৫ দশমিক ৯ শতাংশ (প্রক্ষেপণ ২১ দশমিক ৬ শতাংশ)। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, পলিসি রেট বা এসএলএফ নয়, বরং পাবলিক লেন্ডিংয়ের কারণেই প্রাইভেট লেন্ডিং কমে গেছে। সে ক্ষেত্রে পলিসি অ্যাড্রেসটাও রাইট জায়গায় নিতে হবে। হ্যাঁ-সুদ কমিয়ে মুদ্রা সরবরাহ বাড়ালে কর্ম ও শিল্পায়ন বাড়তে পারে, আবার ভুল হাতে ঋণ দিলে পাচারও বাড়তে পারে।

FY27-এ ১,১২,০০০ কোটির লক্ষ্য টিকে আছে ৪২ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধির অনুমানে। FY26-এ লক্ষ্য ছিল কম, রাজস্ব এলো না, শেষে ব্যাংকঋণ দাঁড়াল ১,৩১,৭১১ কোটি, সংশোধিত লক্ষ্যের চেয়েও বেশি ঋণ করল। অর্থাৎ রাজস্ব-অনুমান ভাঙলেই সরকারের ব্যাংকঋণ লক্ষ্যও ভাঙে, আর তখন ক্রাউডিং আউট গভীর হয়। ভুল রাজস্ব লক্ষ্যের সময়ে যখন BB বেসরকারি ঋণ ৮ শতাংশে তোলার লক্ষ্য দিচ্ছে, দুই লক্ষ্য পরস্পরকে খারিজ করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব মডেল বলছে, জুন ২০২৭-এ মূল্যস্ফীতি হবে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ (সুদের হার কমানোয় মডেলিং ফোরকাস্টে এটা বাড়বে), অথচ ঘোষিত সিলিং ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। যে লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজেরই আস্থা নেই, তা প্রত্যাশিত টার্গেট (expectation anchor) হিসেবে অর্জিত হবে না। বরং এসব লক্ষ্য ব্যর্থতার ধারাবাহিকতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে, আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষয় করার চান্স আছে। এমনিতেই ফিচ ও এসঅ্যান্ডপি আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং কমিয়েছে।

লেখক : সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী