শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৪ শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৪ সফর, ১৪৪৮ হিজরি

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন : শেখ হাসিনাকে নিয়ে অস্বস্তিতে দিল্লি

মুক্তবাণী রিপোর্ট : ভারতে চলে যাওয়া বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে দিল্লি কতখানি অস্বস্তিতে আছে-এ বিষয়ে গতকাল বিবিসি নিউজ বাংলা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এ ছাড়া শেখ হাসিনাকে নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে যে টানপোড়েন শুরু হয়েছে, তা নিয়েও গতকাল দ্য ডিপ্লোম্যাট একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দিল্লির পার্লামেন্ট ভবন অ্যানেক্সে ডাকা সর্বদলীয় বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ব্যাখ্যা করেছিলেন, কোন পরিস্থিতিতে ও কেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীকে ভারত আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত এ ব্যাপারে ভারত সরকারের ঘোষিত অবস্থান হলো-শেখ হাসিনার ‘নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই’ তাঁকে ‘তখনকার মতো’ ভারতে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল।
যদিও সেই ‘সাময়িক’ অবস্থান যে দুই বছর বা তারও বেশি সময়ে গড়াবে, তখন তা কেউ ধারণাও করতে পারেননি। তবে এরপর গত দুই বছরে ভারত একাধিকবার প্রকাশ্যে দাবি করেছে, ভারতের মাটিতে অবস্থানকালীন শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বা আওয়ামী লীগ নিয়ে যেসব মন্তব্য করছেন বা যেসব কর্মকান্ডে যুক্ত হচ্ছেন, তা তিনি করছেন ‘ইনডিভিজুয়াল ক্যাপাসিটি’-তে।
তার সঙ্গে ভারতের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু এরপর গত ৫ আগস্টের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে (এফসিসি) যেভাবে শেখ হাসিনা অনলাইনে ‘লাইভ’ সাংবাদিক সম্মেলনে যুক্ত হন, তা অবশ্যই এই বিতর্ককে একটি আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
ভারত কীভাবে শেখ হাসিনাকে এই কাজ করতে দিতে পারল, তার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সেদিন রাতেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি কড়া বিবৃতি জারি করে। গোটা ঘটনায় বাংলাদেশ যে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ, তা বোঝা যায় বিবৃতির ভাষা থেকেও। আসলে ভারত যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করেছে, শেখ হাসিনার এই সাংবাদিক সম্মেলনের সঙ্গে তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই এবং সেখানে তিনি যাই বলুন, তাতে ভারত সরকারের কোনো অনুমোদন নেই। ঘটনাপ্রবাহ থেকে বাংলাদেশ কিন্তু ধরেই নিচ্ছে ভারত সরকারই তাকে এভাবে ইন্টার‌্যাক্ট করার অনুমতি দিয়েছে। শুধু তাই নয়, এফসিসির ইভেন্টে শেখ হাসিনা যা-ই বলেছেন, তা ভারতের প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছাড়া বলেননি বলেও বাংলাদেশ মনে করছে। এখন সেটা আসলে বাস্তবতা হোক বা না হোক, শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভারতের পর্যায়ক্রমিক ধৈর্যচ্যুতি বা অস্বস্তি বেড়ে চলাটা কিন্তু তাতে মিথ্যা হয়ে যাচ্ছে না! কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের দফায় দফায় দাবি বা অনুরোধ সত্ত্বেও শেখ হাসিনার মুখে কেন রাশ টেনে ধরা হচ্ছে না? এই প্রশ্নের জবাবে দিল্লিতে শীর্ষ কর্মকর্তারা একান্ত আলোচনায় সব সময়ই বলেছেন, শেখ হাসিনা একজন রাষ্ট্রীয় অতিথি, কোনো রাজনৈতিক বন্দি নন, কাজেই তার ক্ষেত্রে এরকম বিধিনিষেধ প্রয়োগ করা চলে না। শেখ হাসিনা ভারতে আসার পর থেকে যে জটিল কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, সেটা থেকেও পরিত্রাণ পাওয়ার একটা চেষ্টা যেন গত কয়েক মাসে আরও বেশি করে চোখে পড়ছে। শেখ হাসিনা যে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক সম্পর্কে এই মুহূর্তে অস্বস্তির মূল উপাদান, তাতে কোনো সংশয় নেই। এর প্রধান কারণ, জুলাইয়ের গণ অভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারীদের ‘হত্যা করে নির্মূলের’ নির্দেশসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনা এই মুহূর্তে বাংলাদেশের আদালতে মৃত্যুদন্ড পাওয়া একজন আসামি- যাকে দেশের সরকার ফেরত চাইছে। কিন্তু সেই অনুরোধে সাড়া না দিয়ে ভারত কার্যত চুপচাপ বসে আছে, আর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে, সে গঙ্গা চুক্তিই হোক বা বাণিজ্য বিধিনিষেধ, এটা ছায়া ফেলছে। আসলে ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বহু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা গত দুই বছরে থমকে আছে; আর সেই কথাবার্তা না এগোনোর কারণ হিসেবে দুই পক্ষই শেখ হাসিনার প্রসঙ্গকে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করছে। ফলে ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক যে কিছুতেই স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে পারছে না, তার একটা বড় কারণ শেখ হাসিনা। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর অনড় মনোভাব ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করা ভারতের কর্মকর্তাদেরও বিরক্ত করেছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। আস্থাভাজন বিদেশি বন্ধুরা বিপদে পড়লে বা তাদের জীবনসংকটের মতো পরিস্থিতি হলে আশ্রয় দেওয়াটা ভারতের দীর্ঘদিনের নীতি, শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও সেটাই অনুসৃত হয়েছিল। দালাই লামা বা সাবেক আফগান প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ নাজিবুল্লাহর পরিবার ‘হোস্ট কান্ট্রি’ ভারতের সব ‘চাওয়াপাওয়া’র সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছেন। কিন্তু শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে বিষয়টা ঠিক সেভাবে কাজ করেছে- তা বলা যাবে না। মানে দালাই লামা যেভাবে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির একটি সফল ‘হাতিয়ার’ হয়ে উঠতে পেরেছেন, শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। অর্থাৎ ‘অ্যাসেট’ বা সম্পদ হিসেবে নয়, তার ক্ষেত্রে বরং ‘লায়াবিলিটি ফ্যাক্টর’ বা বোঝা হয়ে দাঁড়ানোর বিষয়টাই বেশি বড় হয়ে উঠেছে বলে দিল্লিতে পর্যবেক্ষকদের ধারণা। আঞ্চলিক জিওপলিটিক্সের বাস্তবতাও শেখ হাসিনাকে নিয়ে দিল্লির অস্বস্তি বাড়িয়েছে।

এদিকে অনলাইন সাময়িকী দ্য ডিপ্লোম্যাট-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলনকে ঘিরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। নতুন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে এই সম্পর্ক। বাংলাদেশের কূটনৈতিক সতর্কবার্তার পরও নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনা ওই সংবাদ সম্মেলন করেন। এ নিয়ে চারদিকে শোরগোল। খোদ ভারতীয় সাংবাদিকরাও বলছেন, এতে ভারত সরকারের সায় ছিল। তা না হলে রাজধানী নয়াদিল্লির মতো জায়গায় হাসিনা সংবাদ সম্মেলন করতে পারতেন না। এ ছাড়া ওই সংবাদ সম্মেলনে হাস্যরস, ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের উপস্থিতির ধরন নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। আগে থেকেই আলোচক প্যানেলে তার নাম ছিল। কয়েক দিন আগেই এ বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। অনলাইন পোস্টার বানানো হয়। কিন্তু আলোচনার নির্দিষ্ট সময়ে সাকিব আল হাসান ছিলেন খেলার মাঠে। সেখান থেকে তিনি অনলাইনে যুক্ত হন। এরপর তাকে গাড়ি চালিয়ে বাসায় ফিরতে দেখা যায়। তিনি বাসায় ফিরে ভিডিও মারফত দর্শন দেন। এতে তার দলের প্রতি আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভারতীয় অনেক সাংবাদিক। তবে শেখ হাসিনা ওইদিন সংবাদ সম্মেলনে যে বক্তব্য দিয়েছেন বা দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন, তাতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশের বিএনপি সরকার। নয়াদিল্লিতে এমন একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের সুযোগ দেওয়ায় ভারত সরকারের প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ঢাকা। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে এই অনুষ্ঠানের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আগেই ভারতকে উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছিল। এর পরও অনুষ্ঠানটি হওয়াকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা এবং ‘জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি গুরুতর অপমান’ হিসেবে উল্লেখ করেছে ঢাকা।

হাসিনা বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্য ও গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেওয়ায় ঢাকা বারবার ভারতকে তার রাজনৈতিক কর্মকান্ড সীমিত করার অনুরোধ জানিয়েছে। একই সঙ্গে তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবিও জানানো হয়েছে। কিন্তু দিল্লি এখনো এসব অনুরোধে সাড়া দেয়নি। ডিপ্লোম্যাট আরও লিখেছে, ভারতের জন্য হাসিনাকে জোর করে বাংলাদেশে পাঠানো বাস্তবসম্মত কোনো বিকল্প নয়। তবে তিনি যদি স্বেচ্ছায় দেশে ফেরেন, তাহলে তা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বর্তমান উত্তেজনা কিছুটা কমাতে পারে। এদিকে হাসিনা দেশে ফিরলে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারত ইউরোপের কয়েকটি দেশের সঙ্গে পর্দার আড়ালে আলোচনা করছে- এমন জল্পনাও রয়েছে। তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।