বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৫ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৬ রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা যতটা, সীমাবদ্ধতাও ততটা

নিজস্ব প্রতিবেদক : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে এবার দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদকক্ষে এ ভোটগ্রহণ হবে।
শনিবার শপথ নেবেন নতুন রাষ্ট্রপতি।

তবে সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির পদকে অনেকটা আনুষ্ঠানিক বা আলংকারিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার হাতে থাকায় রাষ্ট্রপতির অধিকাংশ সাংবিধানিক ক্ষমতাই সীমিত। তবে রাষ্ট্রের সংকটময় বা বিশেষ পরিস্থিতিতে এ পদই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন একাধিক নজিরও রয়েছে।

১৯৯১ সালে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান এবং প্রধানমন্ত্রী সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির অধিকাংশ কাজই প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শনির্ভর।

সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি নিজস্ব বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

এ দুটি বিষয় ছাড়া রাষ্ট্রপতিকে তাঁর অন্যান্য দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়।

সংবিধানের ৫৬(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে সেই ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করবেন, যিনি তাঁর কাছে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন বলে প্রতীয়মান হন। ফলে সাধারণ পরিস্থিতিতে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বা জোটের নেতা বা তাদের মনোনীত ব্যক্তিই প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

রাষ্ট্রপতির অন্যান্য সাংবিধানিক দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে সংসদ আহ্বান, স্থগিত ও ভেঙে দেওয়া, সংসদে পাস হওয়া বিলে সম্মতি দেওয়া, জরুরি অবস্থা ঘোষণা, রাষ্ট্রদূত নিয়োগ, যুদ্ধ ঘোষণা, শান্তিচুক্তি অনুমোদন এবং দণ্ডিত ব্যক্তিকে ক্ষমা প্রদর্শন। তবে এসব ক্ষেত্রেও তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়।

এ ক্ষেত্রে সংবিধানের ৪৮ (৩) অনুচ্ছেদে আরও বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে কোনো পরামর্শ দিয়েছেন কি না এবং দিয়ে থাকলে কী পরামর্শ দিয়েছেন, কোনো আদালত সে বিষয়ে কোনো প্রশ্ন তুলতে পারবে না। ফলে রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত গ্রহণের সাংবিধানিক কাঠামো মূলত প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শনির্ভর।

তবে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাকে শুধু আনুষ্ঠানিক হিসেবে দেখারও সুযোগ নেই। বিশেষ করে সংসদে কোনো দলের স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকা, সরকার গঠনে জটিলতা তৈরি হওয়া কিংবা সাংবিধানিক সংকটের মতো পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ এমন পরিস্থিতিতে কাকে সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়া হবে, তা নির্ধারণে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব সামনে আসে।

সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা নির্দিষ্ট নিয়ম ও সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকলেও রাষ্ট্রের বিশেষ পরিস্থিতিতে তাঁর পদটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন সংকটময় সময়ে রাষ্ট্রপতিকে অপেক্ষাকৃত স্বাধীনভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে দেখা গেছে।

ফলে রাষ্ট্রপতির পদকে একদিকে যেমন নির্বাহী ক্ষমতাহীন আনুষ্ঠানিক পদ হিসেবে দেখা হয়, অন্যদিকে সাংবিধানিক সংকটের মুহূর্তে রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত রাষ্ট্র পরিচালনার গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এ কারণে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বোঝার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক সময়ের সাংবিধানিক বিধান এবং বিশেষ পরিস্থিতির বাস্তবতা এ দুই দিকই বিবেচনায় নিতে হয়।