সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৯ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১০ রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

আকাশপথে অর্থ পাচার : বিমানের সুনাম রক্ষায় চাই কঠোর ব্যবস্থা

জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ঝকঝকে ইউনিফর্মের আড়ালে গড়ে ওঠা হুন্ডি ও অর্থ পাচার সিন্ডিকেটের সাম্প্রতিক চাঞ্চল্যকর উন্মোচন দেশের আর্থিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্য এক উদ্বেগজনক বার্তা বহন করছে। শনিবার পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে দুবাই স্টেশনে ১৯৬ জন কেবিন ক্রুর ওভারসিজ ভাতার কোটি কোটি টাকা ব্যক্তিগত চেকে একবারে উত্তোলন করে স্থানীয় হুন্ডি এজেন্টের হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনা শুধু সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করার অপরাধই নয়, এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ছত্রছায়ায় সংঘটিত একটি নজিরবিহীন মেগা স্ক্যাম। গত দুই বছরে একটি চিহ্নিত চক্রের মাধ্যমে প্রায় ১০০ কোটি টাকা লোপাট ও পাচারের যে তথ্য উঠে এসেছে, তা প্রমাণ করে এটি কোনো বিচ্ছিন্ন অনিয়ম নয়; বরং এটি বিমানের অভ্যন্তরীণ অর্থ বিভাগ, ফাইন্যান্স ম্যানেজার ও শিডিউলিং সিন্ডিকেটের যৌথ যোগসাজশে গড়ে ওঠা এক গভীর শিকড়বিশিষ্ট সুসংগঠিত অপরাধ।

বলা বাহুল্য, একটি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যখন বিমানবন্দর ও প্রটোকলের সুযোগ নিয়ে অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন, তখন প্রতিষ্ঠানের শুধু আর্থিক ক্ষতিই হয় না, বৈশ্বিক এভিয়েশন অঙ্গনে পুরো দেশের নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা মারাত্মক প্রশ্নের মুখে পড়ে। বিমানবন্দরে গ্রিন চ্যানেল ব্যবহারের শিথিলতার সুযোগ নিয়ে বা আন্তর্জাতিক হাবগুলোতে অবৈধ অর্থের হাতবদল করে রাষ্ট্রের আর্থিক ভিত্তিকে দুর্বল করার এ অপচেষ্টা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সরকারের ঘোষিত শূন্য সহনশীলতা নীতিকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে এই অপরাধের মূলোৎপাটন করা এখন সময়ের দাবি।

এই অনিয়ম রোধে এবং বিমানে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। গত কয়েক বছরের সব বৈদেশিক লেনদেন ও ফ্লাইট শিডিউলিং ব্যবস্থার নিবিড় অডিট সম্পন্ন করে অপরাধের পুরো আর্থিক চেইন উন্মোচন করাও জরুরি। পাশাপাশি একক ব্যক্তির নামে বা কেবিন ক্রু ইউনিয়নের নামে এককালীন নগদ অর্থ উত্তোলনের বিতর্কিত চর্চা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রত্যেক কর্মচারীর ভাতা সরাসরি তাদের ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ডিজিটাল ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে প্রেরণের বাধ্যবাধকতা চালু করা দরকার। একইসঙ্গে শুধু অভ্যন্তরীণ বিভাগীয় শাস্তি বা লোকদেখানো বদলিতে সীমাবদ্ধ না থেকে অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইন ও দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের অধীনে জড়িতদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করে দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাছাড়া আন্তর্জাতিক রুটে কর্মরত ক্রুদের কার্যক্রমে অতিরিক্ত গোয়েন্দা নজরদারি এবং বিমানবন্দরে তল্লাশি প্রক্রিয়া আরও জোরালো করা দরকার, যাতে প্রটোকল সুবিধার অপব্যবহার বন্ধ হয়।

জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা কোনো ব্যক্তি বা অপরাধী চক্রের স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হতে পারে না। বিমানের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার এবং আন্তর্জাতিক সুনীতি ও সুনাম অক্ষুণ্ন রাখতে বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়কে এখনই কঠোর ও আপসহীন পদক্ষেপের মাধ্যমে এই আকাশপথের সিন্ডিকেট সম্পূর্ণ নির্মূল করতে হবে।