আক্তার হোসেন ঢালী:
আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলা ঘিরে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক যেন আবারও নতুন করে সামনে এসেছে। মামলার চূড়ান্ত আপিল শুনানি শেষ হওয়ায় এখন অপেক্ষা রায়ের। এর মধ্যেই টঙ্গীর রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক যুবদল নেতা নূরুল ইসলাম সরকারের দীর্ঘ কারাবাস এবং তাকে ঘিরে টঙ্গীবাসীর মুক্তির প্রত্যাশা।
স্থানীয়দের একাংশের দাবি, নূরুল ইসলাম সরকার ছিলেন টঙ্গীর অত্যন্ত জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা। তার দীর্ঘ অনুপস্থিতি শুধু একটি পরিবারের নয়, টঙ্গীর রাজনৈতিক অঙ্গনেরও বড় একটি পরিবর্তনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সেই প্রশ্ন থেকেই আজ নতুন করে আলোচিত হচ্ছে—আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যাকাণ্ডের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কারা লাভবান হয়েছিল, আর কারা হারিয়েছিল?
হত্যাকাণ্ড থেকে রাজনৈতিক ইস্যু:
২০০৪ সালে আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যাকাণ্ডের পরপরই ঘটনাটি স্থানীয় গণ্ডি ছাড়িয়ে জাতীয় রাজনীতির অন্যতম আলোচিত ঘটনায় পরিণত হয়। হত্যাকাণ্ডের কারণ ও এর পেছনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে শুরু হয় পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও অভিযোগ।
পরবর্তী সময়ে মামলাটি তৎকালীন সরকারবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়। অভিযোগ ওঠে, ক্ষমতাসীন চারদলীয় জোটের রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহল এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। সেই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই নূরুল ইসলাম সরকারকে মামলায় ‘হুকুমের আসামি’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মামলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের প্রশ্ন—একজন জনপ্রিয় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে দীর্ঘদিন রাজনীতির বাইরে রাখার ফলে টঙ্গীর তৎকালীন রাজনৈতিক সমীকরণে কারা সুবিধা পেয়েছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর অবশ্য রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়, পাওয়া যেতে পারে মামলার নথি, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে।
জনপ্রিয়তা কি হয়ে উঠেছিল বিপদের কারণ?:
নূরুল ইসলাম সরকারকে ঘিরে টঙ্গীর মানুষের দীর্ঘদিনের আবেগের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তার সমর্থকদের দাবি, রাজনৈতিকভাবে তিনি ছিলেন জনপ্রিয় এবং সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী। ফলে তাকে দীর্ঘদিন রাজনীতির বাইরে রাখা তৎকালীন স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণে প্রভাব ফেলেছিল।
১৯৯৬ সালের পৌর নির্বাচনেও কারাবন্দি অবস্থায় তার প্রতি ভোটারদের সমর্থনের বিষয়টি তার জনপ্রিয়তার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন তার অনুসারীরা।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়—এই জনপ্রিয়তাই কি শেষ পর্যন্ত তাকে মামলার আসামি হওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর চরিত্রে পরিণত করেছিল?
এটি একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন; এর চূড়ান্ত উত্তর নির্ভর করবে আদালতের রায় ও প্রামাণ্য ইতিহাসের ওপর।
একই মামলায় দুই নূরুল ইসলাম, বিভ্রান্তিও কম নয়:
আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলার আলোচনায় ‘নূরুল ইসলাম’ নামটি নিয়ে আরেকটি বিষয় প্রায়ই সামনে আসে। মামলার অন্যতম আসামি জাতীয় পার্টির নেতা নূরুল ইসলাম দিপু এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুল ইসলাম সরকার সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যক্তি ও ভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
দিপু ও তার দুই ভাইকে ঘিরে স্থানীয় ব্যবসায়িক বিরোধ, ঝুট ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের কথাও বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয়েছে। অন্যদিকে নূরুল ইসলাম সরকারকে মামলায় জড়ানোর পেছনে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের বিষয়টি তার সমর্থকরা সামনে আনেন।
অর্থাৎ, একই মামলার ভেতরে থাকা বিভিন্ন চরিত্র, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং স্থানীয় বিরোধ—সবকিছুকে এক সূত্রে দেখার পরিবর্তে পৃথক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করা জরুরি।
হত্যাকাণ্ডের পর বদলে যায় টঙ্গীর রাজনীতি?
নূরুল ইসলাম সরকার দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকায় টঙ্গীর রাজনৈতিক নেতৃত্বের চিত্র কতটা বদলে গিয়েছিল—এ প্রশ্নেরও সহজ উত্তর নেই। তবে তার অনুপস্থিতির সময়ে স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্বের উত্থান এবং ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন ঘটেছিল বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
একই সময়ে আহসান উল্লাহ মাস্টারের হত্যাকাণ্ড তার পরিবারকে ঘিরে ব্যাপক জনসমর্থন ও রাজনৈতিক সহানুভূতির সৃষ্টি করে। তার ছেলে জাহিদ আহসান রাসেলের পরবর্তী রাজনৈতিক উত্থানেও এই আবেগের ভূমিকা ছিল বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষণে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে।
তবে কোনো রাজনৈতিক পরিবারের উত্থানকে সরাসরি একটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে একমাত্রিকভাবে যুক্ত করা সমীচীন নয়। বিষয়টি মূল্যায়নে প্রয়োজন রাজনৈতিক ইতিহাস, নির্বাচনী ফলাফল ও সময়ের সামগ্রিক বাস্তবতা।
২২ বছরের কারাবাস—একটি পরিবারের হারানো সময়:
আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি নূরুল ইসলাম সরকারের জীবনের সবচেয়ে বড় অধ্যায় হয়ে দাঁড়িয়েছে দীর্ঘ কারাবাস। এই সময়ে তিনি হারিয়েছেন আপনজনদের—মা, স্ত্রী, ভাইসহ পরিবারের একাধিক সদস্যকে। তাদের অনেকের শেষ বিদায়েও তিনি উপস্থিত থাকতে পারেননি।
একজন মানুষের জীবনের ২২ বছর—শুধু ক্যালেন্ডারের কয়েকটি সংখ্যা নয়। এটি একটি প্রজন্মের সময়, একটি পরিবারের অসংখ্য স্মৃতি এবং একজন রাজনৈতিক কর্মীর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়।
শেষ প্রশ্ন: ন্যায়বিচার কার জন্য?
আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যার প্রকৃত বিচার অবশ্যই হতে হবে। একজন জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একইভাবে, কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যদি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, ভুল তদন্ত কিংবা অন্য কোনো কারণে বিচারের নামে শাস্তি পেয়ে থাকেন, তার প্রতিকার করাও ন্যায়বিচারেরই অংশ।
তাই ২২ বছর পর আলোচনার মূল বিষয় হওয়া উচিত—কে কোন রাজনৈতিক সুবিধা পেয়েছে, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, প্রকৃত সত্য কী?
আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের সত্য পুরোপুরি উন্মোচিত হোক। আদালতের রায়ে প্রকৃত অপরাধ ও নির্দোষতার বিষয়টি স্পষ্ট হোক। আর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় যেন সত্য ও ন্যায়বিচারের পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়—টঙ্গীবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা এখন সেদিকেই।