শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৮ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৯ রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

সাইবার সুরক্ষা আইন নিয়ে টিআইবির উদ্বেগ, খসড়া পুনর্বিন্যাসের দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক : খসড়া সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন ২০২৬-এ জনগণের মৌলিক মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা ও স্বাধীন মতপ্রকাশের ওপর চরম ঝুঁকি তৈরির মতো নানা বিতর্কিত বিধান রয়েছে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা এবং বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে খসড়াটি পুরোপুরি পুনর্বিন্যাসের জোর দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।

শুক্রবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই দাবি জানান।

তিনি বলেন, খসড়া আইনে সাইবার অপরাধ, সাইবার সুরক্ষা এবং জনগণের মতপ্রকাশের অধিকার—এই তিনটি জটিল বিষয় একসঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে কোনো ক্ষেত্রেই যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি; বরং আইনের অপব্যাখ্যা ও অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, সাইবার অপরাধ ও সাইবার সুরক্ষার মতো বিশেষায়িত বিষয়কে একীভূত করার পাশাপাশি সাইবার জগতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের বিষয়ও আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা বৈশ্বিক উত্তম চর্চার পরিপন্থী।

সংস্থাটির দাবি, খসড়া আইন অনুমোদিত হলে বাংলাদেশের সাইবার স্পেস ‘অবারিত নজরদারি, জবাবদিহিহীন ও নিপীড়নমূলক’ ব্যবস্থায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে ‘গুজব’, ‘অপতথ্য’, ‘হেয়প্রতিপন্ন’, ‘মানহানিকর’ ও ‘রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর’সহ বিভিন্ন ধারণার সংজ্ঞা অস্পষ্ট হওয়ায় এগুলোর ইচ্ছাকৃত অপব্যাখ্যার মাধ্যমে লক্ষ্যভিত্তিক অপব্যবহার হতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

এ ছাড়া ‘যৌন হয়রানি’ ও ‘সেক্সটর্শন’-এর সংজ্ঞা যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ নয় বলেও মন্তব্য করেছে টিআইবি। এর ফলে প্রকৃত অপরাধ আড়াল হওয়ার পাশাপাশি অভিযুক্তের সুরক্ষা এবং ভুক্তভোগীর অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

খসড়া আইনের ৪৬(২) ধারায় ২৩ ধারার অপরাধকে ‘অ-জামিনযোগ্য’ করার প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছে টিআইবি। ‘বৈদেশিক রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক’ বা ‘অন্য কোনো ব্যক্তি/গোষ্ঠীর সুবিধার্থে’—ইত্যাদি অস্পষ্ট টার্ম ব্যবহার করে ভিন্নমত ও স্বাধীন সাংবাদিকতাকে হুমকির মুখে ফেলার সুযোগ রাখা হয়েছে বলে মনে করে সংস্থাটি।

এ ছাড়া আইনের অধীনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও কাউন্সিল সদস্যদের ‘সরল বিশ্বাসে করা কর্মকাণ্ডের’ জন্য ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলা থেকে দায়মুক্তির প্রস্তাবের কঠোর সমালোচনা করেছে টিআইবি। এটি সংবিধানের ‘আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান’ নীতির পরিপন্থী।

জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি।
প্রস্তাবিত ২৮ সদস্যের কাউন্সিলে বেসরকারি পর্যায়ের তথ্যপ্রযুক্তি বা মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ হিসেবে মাত্র দুজনকে অন্তর্ভুক্তির কথা বলা হয়েছে। আবার তাদেরও সরকার মনোনীত করবে।

টিআইবির মতে, এতে কাউন্সিল সম্পূর্ণ সরকারি নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। তাই সরকারের প্রভাবমুক্ত, নিরপেক্ষ ও স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে কাউন্সিল গঠনের আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি বিধিমালার তৈরির ক্ষমতা সরকারের হাত থেকে সরিয়ে স্বাধীন কাউন্সিলের ওপর ন্যস্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

সার্বিকভাবে, খসড়াটি চূড়ান্ত করার পূর্বে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে এটি ঢেলে সাজানোর দাবি জানায় টিআইবি। একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে নাগরিকদের সাইবার সুরক্ষার যে অঙ্গীকার করেছিল, তা বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।