বরিশাল প্রতিনিধি : বরিশালের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির (৫৭) ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
শুক্রবার সন্ধ্যায় নগরীর প্যারারা রোডের দৈনিক সমকালের বরিশাল ব্যুরো অফিস থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।
তথ্য নিশ্চিত করেছেন মহানগরীর কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশের ওসি আল মামুন উল ইসলাম।
তিনি স্ত্রী ও এক কন্যাসন্তান রেখে গেছেন।
পুলক চ্যাটার্জি দীর্ঘদিন দৈনিক যুগান্তর ও দৈনিক সমকালে ব্যুরো প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন। এছাড়া তিনি বরিশাল প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান কার্যকরি কমিটির সদস্য।
দৈনিক সমকালের বর্তমান অফিসপ্রধান সুমন চৌধুরী বলেছেন, সমকালের সাবেক বরিশাল ব্যুরো প্রধান পুলক চ্যাটার্জি তার স্ত্রীর ফোন ধরছিলেন না। বিষয়টি পুলকের স্ত্রী আমাকে (সুমন) জানান। এরপর শুক্রবার সন্ধ্যায় আমি সমকাল অফিসে আসি। তখন অফিসের প্রবেশের দরজা ভেতর থেকে আটকানো দেখতে পাই। পরে দরজার ফাঁক দিয়ে পুলক চ্যাটার্জিকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়। পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে তার মরদেহ উদ্ধার করে।
পুলক চ্যাটার্জি সর্বশেষ দৈনিক সমকালের বরিশাল ব্যুরো প্রধান ছিলেন। প্রায় তিন বছর আগে সমকাল থেকে চাকরি চলে যাওয়ার পর থেকেই তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় ছিলেন। জ্যেষ্ঠ সংবাদকর্মী ও সাবেক ব্যুরো প্রধান হিসেবে মাঝেমধ্যেই তিনি সমকাল অফিসে এসে বসতেন এবং পত্রিকা পড়তেন।
সমকালের বর্তমান বরিশাল অফিস প্রধান সুমন চৌধুরী জানান, সাবেক ব্যুরো প্রধান ও জ্যেষ্ঠ সংবাদকর্মী হিসেবে পুলক চ্যাটার্জির অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে অফিসে ঢোকার একটি চাবি তাকে দেওয়া হয়েছিল। শুক্রবার দিনের কোনো একসময় ওই চাবি দিয়ে অফিসে ঢুকে তিনি আত্মহত্যা করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনার সময় দৈনিক সমকালের পিয়ন দীপক অফিসে ছিলেন না। তিনি ছুটিতে ছিলেন। তাই পুরো অফিসে পুলক চ্যাটার্জি ছাড়া আর কেউ ছিলেন না। খবর পেয়ে পুলিশ দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে লাশ উদ্ধার করে। পরে তা ময়নাতদন্তের জন্য শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
বরিশাল মহানগরীর কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আল মামুন উল ইসলাম বলেছেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পরই তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বলা যাবে।
বরিশাল মহানগর পুলিশের উপ কমিশনার সুশান্ত সরকার মন্তব্য করেন, তিনি একজন সজ্জ্বন ব্যক্তি ছিলেন। আমরা ঘটনা শোনার পর পুলিশ পাঠিয়েছি। পুলিশ সকলের উপস্থিতিতে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। প্রাথমিকভাবে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা বলে মনে হচ্ছে। বিষয়টি তদন্ত করবে পুলিশ। সিআইডি টিম ঘটনাস্থলে এসে বিষয়টি তদন্ত করেছে।
এদিকে পুলক চ্যাটার্জীর মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে বরিশালের সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে।
মরদেহ উদ্ধারের সময় ঘটনাস্থল থেকে ৫টি সুইসাইড নোট উদ্ধার করেছে পুলিশ।
পুলক চ্যাটার্জী তার স্ত্রী ও মেয়ে, ছোট ভাই দীপক চ্যাটার্জী, বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসেন, দৈনিক সমকালের বরিশাল ব্যুরোর দায়িত্বরত সুমন চৌধুরী ও প্রশাসনের উদ্দেশ্যে পৃথক ৫টি সুইসাইড নোট লিখে যান।
প্রশাসনের উদ্দেশ্যে সুইসাইড নোটে পুলক উল্লেখ করেছেন, ‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। আমি শরীরের রোগ যন্ত্রনা সহ্য করতে পারছিলাম না। সুস্থ থাকার জন্য অনেক চেষ্টা করেছি। ইন্ডিয়ার ভেলোরে পর্যন্ত ডাক্তার দেখিয়েছি। কিন্তু সুস্থ হতে পারিনি। অসুস্থতা আমাকে সামাজিকভাবে পিছিয়ে দিচ্ছে। শরীরের যন্ত্রনাকালে কোথাও যেতে পারতাম না। আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী না। প্রশাসনের কাছে অনুরোধ, কোনো প্রকার হয়রানী না করে আমার লাশ আমার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হোক।”
পুলক স্ত্রী প্রিয়াংকা ও মেয়ে প্রকৃতির উদ্দেশ্যে লিখেছেন, আমাকে ক্ষমা করে দিও। পৃথিবীতে কারো জন্য কিছু থেমে থাকে না। প্রকৃতি তুমি পড়াশোনা ও গান শেখা চালিয়ে যেও। প্রিয়াংকা আমার অনুপস্থিতি তোমার জীবনে পূরণ হবার নয়। তারপরও কারো জন্য কিছু থেমে থাকে না। তোমার দীপক (চান) ভাইয়ের সাথে থেকো। দীপক তোমাকে আগলে রাখবে।
বরিশাল প্রেসক্লাব সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসেনকে পুলক চ্যাটার্জী লিখেছেন, বিদায়। তোমার সাথে আমার অনেক স্মৃতি। আমার মরদেহ হয়রানী ছাড়া পরিবারের কাছে দেওয়ার চেষ্টা করিও। যেহেতু স্বেচ্ছায় আত্মহনন করলাম তাই ময়নাতদন্ত করার প্রয়োজন নাই। পারলে তোমার বৌদি ও প্রকৃতিকে মাঝে মাঝে খোজ নিও।
ভাই দীপক ও দীপকের স্ত্রী ইতির উদ্দেশ্যে পুলক লিখেছেন, বিদায়। প্রিয়াংকা ও প্রকৃতিকে আগলে রাখিস। তোর উপর অনেক বড় বোঝা চাপিয়ে দিলাম। আমাকে ক্ষমা করে দিস। মুক্তিযুদ্ধের ভাতা ও আমার ব্যাংক হিসেবের দেবাশীষের সাথে আলাপ করে পদক্ষেপ নিস। প্রিয়াংকা ও প্রকৃতিকে তোর কাছে রাখিস।
পুলক তার দীর্ঘদিনের সহকর্মী দৈনিক সমকাল বরিশাল ব্যুরোর দায়িত্বরত সুমন চৌধুরীর উদ্দেশ্যে লিখেছেন, সুমন বিদায়। তোমাকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলার জন্য দু:খিত। একসঙ্গে প্রায় দেড়যুগ কাজ করেছি, কখনো কোনো কষ্ট পেয়ে থাকলে ক্ষমা করে দিও। যদি পারো সমকালে আমার পাওনা টাকা আদায় করে তোমার বউদির হাতে দিও।