সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৬ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৯ রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

পদ্মার চরাঞ্চল : জেলে কার্ড নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ, বঞ্চিত প্রকৃত জেলেরা

মুক্তবাণী রিপোর্ট : পদ্মা নদীতে নিয়মিত মাছ ধরেন, এমন জেলেদের বেশির ভাগই ‘জেলে কার্ড’ বঞ্চিত বলে অভিযোগ উঠেছে।

ইলিশ ধরার মৌসুমে অসাধু মৌসুমী জেলেদের পাশাপাশি বাধ্য হয়েই প্রকৃত জেলেরা ইলিশ শিকারে নামেন বলে জানান তাদের অনেকেই।
যারা পেশায় ‘খাটি’ জেলে তাদের বেশির ভাগেরই নেই কোনো জেলে কার্ড। পান না সরকারি সুবিধা।
অন্যদিকে পেশায় জেলে নন, পদ্মার চরাঞ্চলের এমন অনেকেরই নাম সুবিধাভোগীদের তালিকায় রয়েছে। এ নিয়ে ক্ষোভ স্থানীয় জেলেদের মধ্যে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ নদ-নদীতে মাছ ধরেন-এমন অসংখ্য জেলে রয়েছেন। এর মধ্যে পদ্মার চরাঞ্চলখ্যাত চরজানাজাত, কাঁঠালবাড়ী, বন্দরখোলা ইউনিয়নের নদীর তীরবর্তী এলাকার বেশিরভাগ মানুষই মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন।
এদের মধ্যে ইলিশ শিকারের জন্য রয়েছেন আলাদা জেলে। মূলত, মাছের প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকার সময় সরকারি সুবিধা পেয়ে থাকেন জেলেরা।

তবে এসব এলাকার জেলেদের অভিযোগ, বছরের পর বছর মাছ ধরার পেশায় থাকলেও অনেকেরই কোনো কার্ড নেই। আবার বর্তমানে অনেকে জেলে পেশায় নেই, অথচ সরকারি সুবিধা পাচ্ছেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ম্যানেজ করে চরের অনেকেই জেলে কার্ড করে সুবিধা নিচ্ছেন।

জানা গেছে, নিয়ম অনুযায়ী ইলিশ মাছের প্রজনন মৌসুমে ইলিশ শিকারি জেলেদের মাছ ধরা থেকে বিরত রাখা হয়। সেসময় এক মাসের জন্য তাদের আর্থিক সুবিধা দিয়ে থাকে সরকার। বিশেষ করে চাল বিতরণ করা হয় জেলেদের মধ্যে। শুধুমাত্র ইলিশ শিকারি জেলেদেরই এ তালিকায় থাকার কথা। তবে সব জেলেরই নাম রয়েছে এ তালিকায়। প্রায় ছয় হাজারের বেশি জেলের নাম থাকলেও মাছ ধরার নিষিদ্ধ মৌসুমে আড়াই হাজার জেলে সুবিধা পেয়ে থাকেন। এর মধ্যে আবার বেশির ভাগই জেলে নন বলে জেলেদের অভিযোগ।

উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ছয় হাজার ৫৪২ জন। যার মধ্যে শিবচর পৌরসভায় ২৯৯, ইউনিয়ন পর্যায়ে বন্দরখোলা ৬৭২, সন্ন্যাসীরচর ১৭০, বহেরাতলা দক্ষিণ ৩৪৫, চরজানাজাত ৯৫১, কাঁঠালবাড়ি ৪২১, মাদবরের চর ২৮৭, বহেরাতলা উত্তর ৮৯, ভান্ডারীকান্দি ২২০, বাঁশকান্দি ৫৬৪, নিলখী ৪৮৮, শিরুয়াইল ৩৫৩, দত্তপাড়া ৪৩২, কাদিরপুর ২৮৫, কুতুবপুর ১৯৬, পাঁচ্চর ১৫৪, দ্বিতীয়খন্ড ১৬৩, উমেদপুর ১৬৬, ভদ্রাসন ২৭৬ জনকে প্রকৃত জেলে ‍হিসেবে শনাক্ত করে নিবন্ধন এবং পরিচয়পত্র (কার্ড) দেওয়া হয়েছে। প্রতি বছর জুলাই থেকে ডিসেম্বর মাসের মধ্যে উপজেলা মৎস্য অফিস জেলেদের তালিকা হালনাগাদ করে। এর জন্য সংশ্লিষ্ট উপজেলা পর্যায়ে একটি কমিটিও রয়েছে।
তবে উপজেলা মৎস্য অফিস দাবি করেছে, জেলেদের তালিকা করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। তবে সেই তালিকা হালনাগাদ করা হবে।

স্থানীয় জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলে কার্ড পেতে গিয়ে অনেককেই নানা ধরনের বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হয়েছে। চরজানাজাত এলাকার এক জেলে জানান, দীর্ঘদিন ধরে পদ্মায় মাছ শিকার করলেও তার কোনো কার্ড নেই। নিষেধাজ্ঞার সময় নদীতে নামতে পারেন না। আবার সরকারি সুবিধাও পান না। ওই সময়টা বেশ কষ্টে কাটে।

চরজানাজাত ইউনিয়নের জেলে রাকিব জানান, তার বাবা একজন জেলে ছিলেন। এখন তিনিও মাছ ধরেন। তার বাবা কোনো কার্ড পাননি। এখন তিনিও কার্ড বঞ্চিত। অথচ, যখন তালিকা হয়, তখন প্রকৃত জেলে নন এমন লোকদের নাম তালিকায় আসে।

রহিম মাদবর নামে আরেক ব্যক্তি বলেন, তালিকার মৌসুম এলে জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি জমা নেয়। বার বার দিয়েও কার্ড হয়নি। কাগজপত্র ফটোকপি করতে করতেই দিন পার হয়। কার্ড আসে না। তার মতো আরও অনেক প্রকৃত জেলে তালিকার বাইরে রয়েছেন বলে দাবি তার।

চরজানাজাত ইউনিয়নের বিশিষ্ট সমাজসেবক অ্যাডভোকেট নাসির উদ্দিন বেপারী বলেন, বছরের পর বছর পদ্মায় মাছ শিকার করে যারা পরিবার চালান, সরকারি সহায়তার প্রকৃত দাবিদার তারাই। তাই আমাদের দাবি হলো জেলে কার্ডের তালিকা পুনঃযাচাই করে অনিয়ম দূর করে, অযোগ্য ব্যক্তিদের বাদ দেওয়া এবং দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত প্রকৃত জেলেদের দ্রুত সরকারি সহায়তার আওতায় নেওয়া দাবি জানাই।

শিবচর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সত্যজিৎ মজুমদার বলেন, উপজেলায় জেলে তালিকায় ছয় হাজারের বেশি নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে সহায়তা পাচ্ছেন আড়াই হাজার জেলে। তালিকা বেশ আগের তৈরি করা। এটা হালনাগাদের কাজ চলছে। যাচাই-বাছাই করে নাম বাদ দেওয়া এবং অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচএম ইবনে মিজান বলেন, প্রকৃত জেলেরা বঞ্চিত হচ্ছেন এবং যারা জেলে নন, তারা জেলে কার্ডের সুবিধা পাচ্ছেন এমন অভিযোগ পেয়েছি। এ বিষয়ে কাজ শুরু করা হয়েছে। অভিযোগগুলো যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।