বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৮ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১১ রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

একদিনের সফরে পাহাড়, ঝর্ণা আর সমুদ্রের মায়া

মুক্তবাণী রিপোর্ট : আকাশছোঁয়া পাহাড়ের বুক চিরে সহস্রধারায় হিমশীতল পানির অবিরাম ঝরে পড়া, প্রকৃতির এমন অপরূপ সৌন্দর্যের নাম ঝর্ণা। যারা পাহাড় ঘুরতে ভালোবাসেন, তাদের কাছে ঝর্ণা অন্যতম আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান।
পাহাড়ের উঁচু-নিচু পাথুরে ও পিচ্ছিল পথ পেরিয়ে ঝর্ণার ঠিক নিচে পৌঁছে শীতল পানিতে গা ভেজানোর অনুভূতিই যেন আলাদা এক আনন্দ।

এই আনন্দ আর প্রকৃতির মায়ায় মুগ্ধ হতে প্রতিদিন ছুটে আসেন অসংখ্য দর্শনার্থী চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সহস্রধারা-১ ও ২ ঝর্ণায়।
ঢাকা থেকে তুলনামূলক কম খরচে ঝর্ণা দেখার পাশাপাশি চন্দ্রনাথ পাহাড় ও গুলিয়াখালী সমুদ্রসৈকতও ঘুরে দেখা যায়। ফলে একদিনের ভ্রমণের জন্য সীতাকুণ্ড হয়ে উঠেছে বেশ আকর্ষণীয় একটি গন্তব্য।

লক্ষ্য যখন চন্দ্রনাথের চূড়া:

চট্টগ্রাম থেকে বাসে করে সীতাকুণ্ড বাজারে পৌঁছালাম সকাল ৯টা ৫ মিনিটে। সেখান থেকে একটি ইজিবাইক ভাড়া করে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছে শুরু হলো ওপরে ওঠার প্রস্তুতি।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান হওয়ায় পর্যটকদের পাশাপাশি অসংখ্য নারী-পুরুষকে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে দেখা গেলো। একইসঙ্গে ছিল সাধারণ দর্শনার্থীরাও। পাহাড়ে ওঠার আগেই অনেককে বাঁশের লাঠি ভাড়া নিতে দেখা গেলো। সকালে বৃষ্টি হওয়ায় পাহাড় ছিল বেশ সতেজ। একইসঙ্গে পথও হয়ে উঠেছিল পিচ্ছিল। চন্দ্রনাথ পাহাড় বেশ খাড়া হওয়ায় ভারসাম্য রক্ষার্থে কোথাও কোথাও বাঁশের লাঠিতে ভর করে উঠতে হয়। সিঁড়ির পাশাপাশি পাহাড়ি পথ ধরেও ওপরে ওঠা যায়।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অবস্থিত চন্দ্রনাথ পাহাড় বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত পাহাড়ি ও ধর্মীয় পর্যটনস্থল। পাহাড়, সবুজ প্রকৃতি, মেঘ আর দূরের সমুদ্রের অপরূপ দৃশ্য মুগ্ধ করবে যে কাউকেই।

চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়ায় রয়েছে ঐতিহ্যবাহী চন্দ্রনাথ মন্দির। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি তীর্থস্থান। বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, পাহাড়ের প্রায় ৩৫০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই মন্দিরকে ঘিরে দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ঐতিহ্য রয়েছে। প্রতিবছর ফাল্গুন মাসে শিব চতুর্দশী উপলক্ষে এখানে বড় ধরনের মেলা বসে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অসংখ্য তীর্থযাত্রী ও দর্শনার্থী তখন এখানে আসেন। সাধারণ ভ্রমণপ্রেমীদের কাছেও চন্দ্রনাথ শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, এটি দারুণ একটি অ্যাডভেঞ্চার ভ্রমণকেন্দ্রও। পাহাড়ের পাদদেশ থেকে চূড়ার দিকে উঠতে হয় পায়ে হেঁটে। কোথাও সিঁড়ি, কোথাও খাড়া ও পাথুরে পথ। সীতাকুণ্ড ভ্রমণে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়ায় ওঠাই দর্শনার্থীদের অন্যতম লক্ষ্য।

শারীরিকভাবে বেশ শক্তপোক্ত না হলে পাহাড়ে ওঠা কিছুটা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু উঠতে উঠতে চারপাশের সবুজ পাহাড়, গাছপালা আর নিচের জনপদের দৃশ্য মনকে আনন্দ দেয়। চূড়ার কাছাকাছি পৌঁছালে ক্লান্তির সঙ্গে যোগ হয় এক ধরনের রোমাঞ্চ।

বর্ষাকালে হুটহাট মেঘে ছেয়ে যায় পাহাড়। ঝরে বৃষ্টিও। তবে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে ওঠার সময় বৃষ্টি হলে মেঘের দেখা মেলে সহজেই। পাহাড়চূড়ায় ঘন কুয়াশার মতো মেঘে ডুব দেওয়া যায় সহজেই। আর চূড়ায় পৌঁছে চারপাশের দৃশ্য দেখলে সেই কষ্ট অনেকটাই সার্থক মনে হয়।

মনে একরাশ প্রশান্তি, পুলক আর বিস্ময় এবং শরীরে ভর করা ক্লান্তি নিয়ে পাহাড় থেকে নামার পর আমাদের প্রথম গন্তব্য সহস্রধারা-২ ঝর্ণা। সহজেই এই ঝর্ণায় পৌঁছানো যায় বলে মধ্যবয়সীদের কাছে ঝর্ণাটি দেখতে যাওয়াই থাকে প্রথম পছন্দ। এখানে পৌঁছাতে পাহাড়ি পথে তেমন কোনো ট্র্যাকিংয়ের কষ্ট নেই বললেই চলে।

ঝর্ণার মায়াবী শব্দ:

চন্দ্রনাথ দর্শন শেষ করে আমাদের টিম সহস্রধারার দিকে যাত্রা শুরু করলো। ঝর্ণার শীতল পানিতে গা ভেজানোর জন্য উদগ্রীব দর্শনার্থীদের দলও সহস্রধারায় পৌঁছে ঝর্ণায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকে। টিকিট কেটে নৌকায় স্বল্প দূরত্বের লেক পেরিয়ে ঝর্ণার কাছে পৌঁছাতে হয়। ঝর্ণার কাছে পৌঁছাতেই উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন নানা বয়সী দর্শনার্থীরা। ঝর্ণাধারার নিচে গা এলিয়ে দেওয়া, গোসল করা এবং ছবি তোলায় ব্যস্ত সময় পার করতে থাকেন তারা।

পাহাড়ি পথ পেরিয়ে ঝর্ণার কাছে পৌঁছানোর মুহূর্তেই চোখে পড়ে পাথরের বুক চিরে নেমে আসা স্বচ্ছ পানির ধারা। বর্ষাকালে এর সৌন্দর্য আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। চারপাশে সবুজ পাহাড়, পিচ্ছিল পাথুরে পথ, ঝর্ণার ঝিরিঝিরি শব্দের সঙ্গে নাম না জানা পাখির ডাক, সব মিলিয়ে তৈরি হয় অন্যরকম এক পরিবেশ।

চন্দ্রনাথ পাহাড় ভ্রমণ ও ঝর্ণায় পৌঁছাতে পাথুরে পথে সতর্কতার সঙ্গে হাঁটার ক্লান্তি মুহূর্তেই দূর হয়ে যায় ঝর্ণার শীতল পানিতে গা ভেজালে। সঙ্গে থাকে চারপাশের প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্য।

একদিনে পাহাড়, ঝর্ণা আর সমুদ্র:

একদিনের ভ্রমণে পাহাড়, ঝর্ণা আর সমুদ্র দর্শনের জন্য সীতাকুণ্ড বেশ জনপ্রিয়। ঝর্ণা দেখা শেষ করে দর্শনার্থীদের বেশিরভাগই দুপুরের দিকে ছুটে যান গুলিয়াখালী সমুদ্রসৈকত দেখতে। জোয়ারের সময় সেখানে বেশ বিপাকে পড়তে হয় দর্শনার্থীদের। সৈকতে পৌঁছানোর পথও বেশ পিচ্ছিল থাকে।

ঢাকা থেকে আসা দর্শনার্থী সৈকত বলেন, ‘সি-বিচের কাছাকাছি হেঁটে যাচ্ছিলাম। তখন একটু একটু করে পানি বাড়ছিল। অর্থাৎ, জোয়ার কেবল আসতে শুরু করেছে। কিছুদূর এগোনোর পরই চারপাশ পানিতে ভরে ওঠে। কাঁচা রাস্তার মাঝে মাঝেই পানি যাওয়ার পথ। আমরা হঠাৎ করেই প্রচণ্ড স্রোতের মুখে পড়ি। অসংখ্য নারী দর্শনার্থী চিৎকার করতে শুরু করেন। যারা একেবারেই নতুন, তাদের কাছে জোয়ারের মুহূর্তটা বেশ আতঙ্কের। যখন জোয়ার থাকে না, তখন গুলিয়াখালী সি-বিচের সৌন্দর্য যে কাউকেই মুগ্ধ করবে।’

ব্যস্ত নগরজীবন থেকে একটু দূরে গিয়ে প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটাতে চাইলে সীতাকুণ্ডের সহস্রধারা-২ হতে পারে চমৎকার একটি গন্তব্য। পাহাড়ের নীরবতা আর ঝর্ণার ধ্বনি মিলে এখানে তৈরি হয় এক অন্যরকম প্রশান্তির পরিবেশ, যা মানবমনে এনে দেয় স্বস্তি ও প্রশান্তি।

সময় নিয়ে গেলে সীতাকুণ্ডে আরও অনেক দর্শনীয় স্থান পরিদর্শনের সুযোগ রয়েছে। তাই স্বল্প খরচে একদিনের জন্য প্রকৃতির সান্নিধ্যে হারিয়ে যেতে চাইলে সীতাকুণ্ড হতে পারে ভ্রমণপিপাসুদের জন্য দারুণ এক পছন্দ।