☰

বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৫ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৮ রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

মিয়ানমারের যুদ্ধজাহাজে রোহিঙ্গা ফেরত পাঠানো শুরু করল মালয়েশিয়া

মিয়ানমারের যুদ্ধজাহাজে রোহিঙ্গা ফেরত পাঠানো শুরু করল মালয়েশিয়া

নিজস্ব প্রতিবদেক : মিয়ানমারের যুদ্ধজাহাজে রোহিঙ্গা ফেরত পাঠানো শুরু করল মালয়েশিয়া
রোহিঙ্গাদের নিয়ে মালয়েশিয়ার লুমুট নৌঘাঁটি অভিমুখে একটি বাস। ছবি: দ্য ইনডিপেনডেন্ট

যুদ্ধবিধ্বস্ত মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে মালয়েশিয়া। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দেশটির সরকার প্রায় ১ হাজার ৫০০ রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানোর কার্যক্রম শুরু করে। এই উদ্যোগের আওতায় শেষ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ হাজার মানুষকে মিয়ানমারে পাঠানো হতে পারে বলে জানা গেছে। তবে জাতিসংঘ, রোহিঙ্গা সংগঠন ও বিভিন্ন মানবাধিকার গোষ্ঠী এই উদ্যোগ বন্ধের দাবি জানিয়েছে।

মালয়েশিয়ার পেরাক রাজ্যের লুমুট নৌঘাঁটিতে মিয়ানমারের দুটি যুদ্ধজাহাজ ও একটি হাসপাতাল জাহাজ ইতিমধ্যে নোঙর করেছে। এসব জাহাজে প্রথম দফার রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর কথা রয়েছে।

মালয়েশিয়া সরকারের দাবি, প্রথম দফায় ফেরত পাঠানো ১ হাজার ৪৭৬ জন স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে ফিরছে। তবে মানবাধিকারকর্মীরা এই দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্য, মালয়েশিয়ায় শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীদের জীবনযাপন অত্যন্ত কঠিন হওয়ায় তথাকথিত ‘স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসন’ আসলে চাপের ফল হতে পারে।

মালয়েশিয়ায় মানবাধিকার সংগঠন বিয়ন্ড বর্ডার্সের প্রতিষ্ঠাতা মাহি রামাকৃষ্ণন বলেন, এটি প্রত্যাবাসন নয়, বরং এমন একটি দেশে মিয়ানমারের নাগরিকদের ফেরত পাঠানো, যেখান থেকে তারা পালিয়ে এসেছে। তাঁর মতে, মিয়ানমারে যে সহিংসতা ও সংঘাত থেকে রোহিঙ্গারা পালিয়েছিল, তা এখনো শেষ হয়নি।

রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী প্যাসিফিস্ট ফারুক বলেন, ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের কেউ সামরিক জান্তার হাতে আটক হতে পারেন, আবার কাউকে সংঘাতের সম্মুখসারিতে ঠেলে দেওয়া হতে পারে। তাঁর ভাষায়, তাদের জন্য এটি ‘মৃত্যুদণ্ডের মতো’ হতে পারে।

রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যের মুসলিমপ্রধান এক জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। মিয়ানমারে তাদের নাগরিকত্বের অধিকার নেই। জাতিসংঘ তাদের বিশ্বের অন্যতম নিপীড়িত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী হিসেবে উল্লেখ করেছে।

২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক অভিযানের পর সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। জাতিসংঘের একটি তদন্তে ওই অভিযানে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া ও অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য উঠে আসে। এ ছাড়া হাজার হাজার রোহিঙ্গা মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নেয়। জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় মিয়ানমার থেকে আসা প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার শরণার্থী রয়েছে; তাদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই রোহিঙ্গা।

এদিকে মিয়ানমারে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে গৃহযুদ্ধ চলছে। সামরিক বাহিনী ও বিভিন্ন সশস্ত্র প্রতিরোধ গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাতের কারণে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চল এখনো অস্থিতিশীল। রাখাইন রাজ্যের বড় অংশও বর্তমানে সশস্ত্র সংঘাতের মধ্যে রয়েছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদ বলেছে, মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি শরণার্থীদের নিরাপদ ও টেকসইভাবে ফেরত যাওয়ার উপযোগী নয়। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, মালয়েশিয়া যাদের ফেরত পাঠানোর জন্য নির্বাচন করেছে, তাদের শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘ জড়িত ছিল না।

মানবাধিকারকর্মীরা আরও আশঙ্কা করছেন, ফেরত পাঠানো রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী কিংবা সংঘাতে জড়িত অন্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর জোরপূর্বক নিয়োগের শিকার হতে পারে। ২০২৪ সাল থেকে সামরিক বাহিনী তিন হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে গ্রাম ও বাস্তুচ্যুতদের শিবির থেকে জোর করে নিয়োগ করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এরই মধ্যে মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গাবিরোধী বক্তব্য ও সামাজিক বিদ্বেষ বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অধিকারকর্মী মার্ক ফার্মানার বলেন, মালয়েশিয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার পরিবর্তে তাদের মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর হাতে তুলে দিলে তা আঞ্চলিকভাবে বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম মিয়ানমারের সামরিক শাসক মিন অং হ্লাইংকে মালয়েশিয়া সফরের আমন্ত্রণ জানানোর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন। তাঁর সরকার মনে করছে, এর মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত করা সম্ভব হতে পারে। তবে মানবাধিকারকর্মীরা এই উদ্যোগেরও সমালোচনা করেছেন।

মানবাধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, মালয়েশিয়া যদি মিয়ানমারের সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে বড় পরিসরে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠায়, তাহলে বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়াসহ যেসব দেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে, তারাও একই পথে হাঁটার চাপ অনুভব করতে পারে। এতে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের দীর্ঘদিনের সংকট আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।