কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি : ‘১৫ বছর হয়ে গেলেও আমার মেয়ে ফেলানী হত্যার বিচার পেলাম না। এখনো দেশের বিভিন্ন সীমান্তে পাখির মতো মানুষ মারা হচ্ছে। আমি যেমন আমার মেয়েকে হারিয়ে চোখের পানি ফেলছি, আর কোনো বাবা-মায়ের কলিজার টুকরা যেন ঝরে না যায়।’—কথাগুলো বললেন কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে বাবার সঙ্গে কাঁটাতার পার হওয়ার সময় বিএসএফের গুলিতে নিহত কিশোরী ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম।
২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি ফুলবাড়ী সীমান্তে বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষের গুলিতে নিহত হয় ফেলানী খাতুন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর কয়েক ঘণ্টা তার মরদেহ কাঁটাতারে ঝুলে থাকার দৃশ্য দেশ-বিদেশে আলোড়ন তোলে। হত্যার ১৪ বছর পার হলেও বিচার পায়নি পরিবার। ভারতের উচ্চ আদালতে মামলা ঝুলে থাকায় দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় আছেন ফেলানীর মা-বাবা।
নুর ইসলাম বলেন, ফেলানী হত্যার বিচার এখনো ভারতের সুপ্রিম কোর্টে ঝুলে আছে। ‘ফেলানী হত্যার সঠিক বিচার হলে আর কোনো বিএসএফ সীমান্তে গুলি করার সাহস পাবে না। এখন আমার বয়স হয়ে গেছে। দেশে নির্বাচনে যে সরকারই আসুক, আমি ফেলানী হত্যার বিচারটা আগে দেখতে চাই। আমি বেঁচে থাকতে ফেলানী হত্যার বিচার দেখতে চাই। মেয়ে হত্যার বিচার না দেখে মরেও শান্তি পাবো না।’
তিনি জানান, অভাবের সংসারে পরিবারসহ ভারতে কাজের সন্ধানে গিয়েছিলেন। মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে দালালের মাধ্যমে দেশে ফেরার সময় হত্যাকাণ্ড ঘটে। তার ভাষ্য, ‘আমার চোখের সামনে বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষ আমার মেয়েকে হত্যা করে। আমি মেয়ের লাশ কাঁটাতারের ওপর ফেলে রেখেই পালিয়ে আসি। এরপর পাঁচ ঘণ্টা আমার মেয়ের লাশ কাঁটাতারে ঝুলে ছিল।’
ফেলানীর মা জাহানারা বেগম বলেন, ‘ফেলানী আমার বড় মেয়ে। হত্যার সময় আমি ভারতে ছিলাম। বোনের ছেলের সঙ্গে মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার জন্য স্বামী ফেলানীকে নিয়ে দেশে ফিরছিলেন। সীমান্তে কাঁটাতার পার হওয়ার সময় বিএসএফ গুলি করে আমার মেয়েকে হত্যা করে। ওরা আমার বুকটা খালি করে দিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ফেলানীকে হত্যার ১৪ বছর পেরিয়ে ১৫ বছর হলো, কিন্তু আজও আমি কোনো বিচার পাইনি। আমি ১৪ বছর ধরে আশা করে আছি, কোনো একদিন মেয়ে হত্যার সঠিক বিচার পাবো।’ তিনি বর্তমান সরকারের কাছে বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান।
গত বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি ফেলানীর ছোট ভাই আরফান হোসেন বিজিবির সদস্য হিসেবে যোগ দেন।
হত্যাকাণ্ডের পর ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট ভারতের কোচবিহারে বিএসএফের বিশেষ আদালতে বিচার শুরু হয়। একই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর অভিযুক্ত অমিয় ঘোষকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। পরে বিজিবির আপত্তিতে ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পুনরায় বিচার শুরু হলেও সেখানেও খালাস পান তিনি।
এরপর ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই ভারতীয় মানবাধিকার সংগঠন ‘মাসুম’-এর মাধ্যমে ভারতের উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেন নুর ইসলাম। কয়েক দফা শুনানির তারিখ নির্ধারিত হলেও মামলাটি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।
নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের কলোনিটারী গ্রামের বাসিন্দারা জানান, ফেলানী হত্যার বিচারের পাশাপাশি সীমান্ত হত্যা বন্ধের দাবি দীর্ঘদিনের। তাদের মতে, এই হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত না হওয়ায় সীমান্তে প্রাণহানি বন্ধ হচ্ছে না।
নুর ইসলাম ও জাহানারা বেগম দম্পতির আট সন্তানের মধ্যে সবার বড় ছিলেন ফেলানী। ১৯৯৬ সালে জন্ম নেওয়া ফেলানী পরিবারের সঙ্গে ভারতে বসবাস করছিল। বিয়ের উদ্দেশ্যে দেশে ফেরার পথে সীমান্তে প্রাণ হারায় সে।