শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৬ মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
১০ শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছায়নি ৩০ লাখ পাঠ্যবই

বিশেষ প্রতিনিধি : নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার প্রায় এক মাস পার হলেও এখনো শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছায়নি ৩০ লাখের বেশি পাঠ্যবই। পহেলা জানুয়ারি বই উৎসবের পর ১৫ জানুয়ারির মধ্যে শতভাগ বই বিতরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। কিন্তু ২৫ জানুয়ারি পেরিয়েও সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরে বই বিতরণ সম্পন্ন হলেও মাধ্যমিক স্তরে, বিশেষ করে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে, সবচেয়ে বেশি ঘাটতি রয়ে গেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এখনো বই ছাপা ও বিতরণের কাজ চলমান রয়েছে। ফলে যথাসময়ে বই বিতরণে ব্যর্থতার দায় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এনসিটিবির দাবি, চলতি মাসের মধ্যেই শতভাগ পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে যাবে।

এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, এবার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক মিলিয়ে মোট ১০৫টি প্রেসের মাধ্যমে ৩০ কোটি ২৩ লাখ ৬৫ হাজার ৬৫৩ কপি পাঠ্যবই ছাপার পরিকল্পনা ছিল। এর মধ্যে মুদ্রণ সম্পন্ন হয়েছে ২৯ কোটি ৯১ লাখ ১৮ হাজার ৩৫৪ কপি, যা শতকরা হিসাবে ৯৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

নথি বলছে, ২৪ জানুয়ারি রাত ৮টা পর্যন্ত উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছেছে ২৯ কোটি ৭১ লাখ ৮০ হাজার ৮৫৯ কপি বই। ফলে এখনো বিতরণ বাকি রয়েছে ৩০ লাখ ৫৮ হাজার ৭৯৪ কপি পাঠ্যবই, যা মোট নির্ধারিত বইয়ের ১ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ কাগজে-কলমে প্রায় শতভাগ বিতরণ দেখালেও বাস্তবে লক্ষাধিক শিক্ষার্থী এখনো বই হাতে পায়নি।

স্বস্তির বিষয় হলো, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক (সাধারণ) স্তরে বই বিতরণ পুরোপুরি সম্পন্ন হয়েছে। প্রাক-প্রাথমিক স্তরে ৬৭টি প্রেসের মাধ্যমে নির্ধারিত ৮ কোটি ৫৯ লাখ ২৫ হাজার ৩৭৯ কপি পাঠ্যবইয়ের মুদ্রণ, পিডিআই ও ডেলিভারি শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। একইভাবে, প্রাথমিক স্তরে ৩১ কোটি ১০ লাখ ৯ হাজার ৩৪৭ কপি বইয়ের মুদ্রণ ও বিতরণও শতভাগ শেষ হয়েছে।

সংকট কেন্দ্রীভূত হয়েছে মাধ্যমিক স্তরে। ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত মোট বই নির্ধারিত ছিল ১৮ কোটি ৩২ লাখ ৪ হাজার ৯২৭ কপি। এর মধ্যে মুদ্রণ সম্পন্ন হয়েছে ১৮ কোটি ২৯ লাখ ৮৩ হাজার ৮৫৮ কপি (৯৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ)। তবে বিতরণ পর্যায়ে গিয়ে এই হার কমে দাঁড়িয়েছে ৯৮ দশমিক ৩৩ শতাংশে। ফলে মাধ্যমিক স্তরেই আটকে রয়েছে পুরো ৩০ লাখ ৫৮ হাজার ৭৯৪ কপি বই, যা এই স্তরের মোট বইয়ের ১ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

শ্রেণিভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ষষ্ঠ শ্রেণিতে নির্ধারিত ৪ কোটি ৪৩ লাখ ১৭ হাজার ৫০৯ কপি বইয়ের মধ্যে উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছেছে ৪ কোটি ৪২ লাখ ৪ হাজার ৮৬৬ কপি। ফলে এখনো ১ লাখ ১২ হাজার ৬৪৩ কপি বই বিতরণ বাকি রয়েছে। সপ্তম শ্রেণিতে পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ। এখানে নির্ধারিত ৬ কোটি ৭ লাখ ৫ হাজার ৯০০ কপির মধ্যে বিতরণ হয়নি ১০ লাখ ৭৬ হাজার ৩২২ কপি বই, যা মোটের ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ। অষ্টম শ্রেণিতে নির্ধারিত ৩ কোটি ৯৭ লাখ ২৫ হাজার ৫৮৮ কপির মধ্যে বিতরণ হয়নি ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬৬৫ কপি বই। নবম শ্রেণিতে নির্ধারিত ৫ কোটি ৭ লাখ ৬৮ হাজার ৯২৪ কপির মধ্যে অবিতরণকৃত রয়েছে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৪৪৯ কপি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই ছাপার কাজ রিটেন্ডারের মধ্যে পড়ায় আগেভাগে প্রস্তুতি নেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বই ছাপা ও বিতরণ সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি। দরপত্র প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু হওয়ায় প্রেস নির্বাচন, কাগজ সংগ্রহ, মুদ্রণ সূচি নির্ধারণ ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বিলম্ব ঘটে। এর ফলে সার্বিক বিতরণ কার্যক্রমে চাপ তৈরি হয়।

রিটেন্ডারের পেছনে অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের অভিযোগও রয়েছে। জানা গেছে, নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রেসকে সুবিধা দিতে দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটানো হয়েছিল। অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত পারচেজ কমিটি ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির পাঠ্যবই ছাপার ৬০৩ কোটি টাকার দরপত্র বাতিল করে। পরবর্তী সময়ে রিটেন্ডারের ফলে বই ছাপার কার্যাদেশ পেতে বিলম্ব হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ে পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ শুরু করতে পারেনি। এতে মুদ্রণ সূচি সংকুচিত হয়ে পড়ে এবং উপজেলা পর্যায়ে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ বাড়ে।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) বিতরণ নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মতিউর রহমান খান পাঠান জানিয়েছেন, চলতি মাসের মধ্যে সব বই বিতরণ সম্ভব হবে। তিনি বলেন, মুদ্রণ প্রক্রিয়ায় ‘শর্ট বই’ নামে একটি স্বাভাবিক সমস্যা থাকে। কাগজ কাটা, ছাপার সময় কাগজ নষ্ট হওয়া কিংবা মুদ্রণ ত্রুটির কারণে প্রতিটি প্রেসে কিছু সংখ্যক বই কম-বেশি হয়। সব মিলিয়ে এই ঘাটতির কারণেই সামান্য একটি শতাংশ বই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিতরণ করা সম্ভব হয়নি।

তিনি আরও বলেন, এনসিটিবির কাছে ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত বই বিতরণের পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড রয়েছে। অধিকাংশ বই ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে পৌঁছে গেছে। বর্তমানে অবশিষ্ট প্রায় এক শতাংশ বই রয়েছে, যা সংখ্যার হিসাবে কয়েক লাখ কপি। আশা করা হচ্ছে, আগামী ২৮ জানুয়ারির মধ্যে শতভাগ বই বিতরণ সম্পন্ন হবে।

অন্যদিকে, এনসিটিবির চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী জানিয়েছেন, সময়মতো শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছাতে হলে টেন্ডার ও ছাপা সংক্রান্ত কার্যক্রমগুলো আরও আগে থেকেই শুরু করতে হবে। তিনি বলেন, এবার কাজ আগেভাগে শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি আগের বছরের তুলনায় উন্নত। ভবিষ্যতে পহেলা জানুয়ারির বই উৎসবের মধ্যে শতভাগ বই বিতরণ নিশ্চিত করতে হলে আরও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, আগাম প্রস্তুতি এবং সময়ভিত্তিক ধাপগুলো স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে।