আন্তর্জাতিক ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের জেরে অস্থির হয়ে পড়েছে বিশ্বের জ্বালানি তেলের বাজার। এরই মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ১২০ ডলারে উঠেছে। এতে বিভিন্ন শেয়ারবাজারে সূচকের বড় ধরনের পতন হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধের জেরে অগ্নিগর্ভে পরিণত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চল। বন্ধ হয়ে গেছে হরমুজ প্রণালি। এতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০ ডলারে উঠেছে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন শেয়ারবাজারে সূচকের বড় ধরনের পতন হচ্ছে।
এশিয়ার বাজারে কেনাবেচা শুরু হওয়ার পরই সোমবার সকালে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। এরপর সময়ের সঙ্গে বেড়েই চলেছে দাম। যে আশঙ্কা এত দিন ধরে করা হচ্ছিল, সোমবার সকালে তার বাস্তব রূপ দেখা যায়। সেই সঙ্গে এশিয়ার শেয়ারবাজারে সূচকের বড় পতন হয়েছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, চলতি সপ্তাহে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাবে। বাস্তবে দেখা গেল, সপ্তাহের প্রথম দিনই (এশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোয় সপ্তাহ শুরু হয় সোমবার থেকে) তেলের দাম সেই শিখর স্পর্শ করল।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করছে। কোনও পক্ষই ছাড় দিতে রাজি নয়।
আরও আশঙ্কা হলো, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হতে পারে।
রবিবার ইরান ঘোষণা দিয়েছে, দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হিসেবে আলী খামেনির উত্তরসূরি হবেন তার ছেলে মোজতবা খামেনি। সংঘাত শুরুর এক সপ্তাহের মাথায় এ ঘোষণা থেকে বোঝা যায়, তেহরানের ক্ষমতার কেন্দ্র এখনও খামেনির অনুসারীদের নিয়ন্ত্রণে।
এর মধ্যে শনিবার ও রবিবার ইরানের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তেলের ডিপোসহ বিভিন্ন স্থাপনায় এসব হামলা করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে সারা বিশ্বের ভোক্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর তার প্রভাব পড়বে।
বিবিসি ও অয়েল প্রাইস ডটকমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার এশিয়ার বাজার খোলার পর দেখা যায়, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২২ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৫ ডলারে উঠেছে একই সময়ে ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ২২ শতাংশ বেড়ে ১১৩ দশমিক ৪০ ডলারে উঠেছে। মারাবান ক্রুডের দাম ১২০ ডলারে উঠেছে।
এপির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সোমবার সকালে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৯.৫০ ডলারে উন্নীত হয়। তবে পরে তা ১১২.৯৮ ডলারে লেনদেন হয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত হালকা, অপরিশোধিত তেল ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট প্রতি ব্যারেল ১১৯.৪৮ ডলারে উন্নীত হয়। কিন্তু পরে আবার ১১০.১৭ ডলারে নেমে আসে।
আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল(আইএমএফ) বলছে, তেলের দাম প্রতি ১০ শতাংশ বৃদ্ধির বিপরীতে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বাড়বে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ। ফলাফল— বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমবে শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ।
শেয়ারবাজারেও পতন
তেলের দামের এই উল্লম্ফনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের শেয়ারবাজারগুলোয় সূচকের বড় ধরনের পতন হয়েছে। জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক ৭ শতাংশের বেশি কমেছে। হংকংয়ের হ্যাংসেং সূচক নেমেছে ৩ শতাংশের বেশি। অস্ট্রেলিয়ার এএসএক্স ২০০ সূচক কমেছে ৪ শতাংশেরও বেশি।
দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি সূচকের পতন ছিল আরও তীব্র—৮ শতাংশের বেশি। বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে শেয়ার বিক্রি শুরু করেন। এই আতঙ্কজনিত বিক্রি ঠেকাতে ২০ মিনিটের জন্য লেনদেন বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাজারে অতিরিক্ত বিক্রি ঠেকাতে ব্যবহৃত এই ব্যবস্থা হলো ‘সার্কিট ব্রেকার’। এর আগেও বুধবার কোসপি সূচক ১২ শতাংশ পড়ে গেলে একই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
গত সপ্তাহ পর্যন্ত বাজারে এতটা আতঙ্ক দেখা যায়নি। যদিও উপসাগরীয় অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতে পারবে না বা সেগুলো ঘুরপথে নিয়ে যেতে হবে, সেই ঝুঁকি ছিল। শনি ও রবিবার সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধির সঙ্গে ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংসের ঘটনা বাজারে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বাস্তবতা হলো, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আটকে আছে। এই পরিস্থিতিতে ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত- ওপেকের এই তিনটি বড় উৎপাদক দেশ তেল উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে।
সূত্র: এপি, আল-জাজিরা, বিবিসি, জেরুজালেম পোস্ট, তাস, দ্য গ্লোব অ্যান্ড মেইল, ওয়েল প্রাইস ডটকম