মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৯ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৫ জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

ইসলামী ব্যাংক : গ্রাহকদের মানববন্ধনে পুলিশের জলকামান সাউন্ড গ্রেণেডে আহত অর্ধশতাধিক

নিজস্ব প্রতিবেদক : ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির নেতৃত্ব পরিবর্তনকে ঘিরে রাজধানীর মতিঝিলে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে নতুন নিয়োগের প্রতিবাদ জানিয়ে বিপুলসংখ্যক গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডার সোমবার (১ জুন) ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে সমাবেশ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সকাল থেকেই মতিঝিল এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে জড়ো হতে শুরু করেন বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডাররা। তারা ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রশাসনিক পরিবর্তনের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন এবং নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগ বাতিলের দাবি জানান।

পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়। এ সময় টিয়ারশেল, জলকামান, সাউন্ড গ্রেনেড ও লাঠিচার্জের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ ওঠে। এতে শতাধিক গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডার আহত হন এবং প্রায় ৫০ জন গ্রাহক গুলিবিদ্ধ হয়েছে। আহতদের কয়েকজনকে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়।

সরেজমিনে ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে গিয়ে দেখা যায়, সকাল ১০ টায় ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সকাল থেকে বিপুল সংখ্যক পুলিশ জলকামান, এপিসি কার সহ মারমুখী অবস্থান গ্রহণ করে। সকাল ৯টা ৩০মিনিটে ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার ও গ্রাহকেরা শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন কর্মসূচি শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ জলকামান, টিয়ারগ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে এবং এলোপাতাড়ি লাঠিচার্জ করতে থাকে। এতে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলন।

এ সময় পুলিশের হামলায় ৫০ জন গুলিবিদ্ধ সহ শতাধিক গ্রাহক আহত হয়। পরে পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে হাজার হাজার ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার ও গ্রাহকেরা আবারও সংগঠিত হয়ে মতিঝিলের ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে অবস্থান গ্রহণ করে। ফলে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পুলিশ ও সাধারণ গ্রাহকেরা ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে মুখোমুখি অবস্থান গ্রহণ করে আছে।

ইসলামী ব্যাংক ভুক্তভোগী গ্রাহক সমন্বয় পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক নুর নবী মানিক জানান, গত ২৪ মে সরকারের অবৈধ হস্তক্ষেপে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং এমডি ওমর ফারুক খানকে জোরপূর্বক পদত্যাগ করানো হয়। ঐদিন বাংলাদেশ ব্যাংক আওয়ামী লীগের দোসর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বিতাড়িত সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশিদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে।

সাথে সাথে ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার ও গ্রাহকেরা আওয়ামী দোসর ব্যাংক লুটেরা এস আলমের তল্পিবাহক খুরশিদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগ বাতিলের দাবি জানান এবং এমডি ওমর ফারুক খানকে স্ব পদে বহাল করার আহ্বান জানান। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রাহকদের দাবি উপেক্ষা করে এস আলম গ্রুপের লোকজনকে ইসলামী ব্যাংকে পূর্ণবাসনের দিকে এগিয়ে যায়।

এরই প্রতিবাদে আজ ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার ও গ্রাহকেরা শান্তিপূর্ণভাবে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করতে গেলে সরকারের নির্দেশে পুলিশ জলকামান, টিয়ারগ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে এবং ব্যাপক লাঠিচার্জ করতে থাকে।

এসময় তিনি আরও জানান, ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সরকারের একটি অংশ পতিত আওয়ামী দোসর এস আলম গ্রুপকে ইসলামী ব্যাংকে পূর্ণবাসনের চেষ্টা করে আসছে। এর প্রতিবাদে গত ২৪ মে সারাদেশে ইসলামী ব্যাংকের প্রতিটি শাখার সামনে ভুক্তভোগী গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডার মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। কিন্তু সরকার ইসলামী ব্যাংকে নগ্ন হস্তক্ষেপ অব্যাহত রেখেছে। তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংক তারল্য সংকটে রয়েছে।

ব্যাংকে কোনো টাকা নেই। গ্রাহকেরা চেক দিয়ে টাকা উত্তোলন করতে পারছে না এমনকি এটিএম বুথেও টাকা পাওয়া যায় না। ইসলামী ব্যাংক ভুক্তভোগী গ্রাহক সমন্বয় পরিষদের পক্ষে থেকে তিনি দাবি জানিয়ে বলেন, অবিলম্বে ইসলামী ব্যাংক থেকে ব্যাংক লুটেরা এস আলম গ্রুপের উত্তরসূরিদের অপসারণ করতে হবে এবং খুরশিদ আলমের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ বাতিল করতে হবে। ইসলামী ব্যাংকের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা ও মালিকদের নিকট ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ প্রদান করতে হবে।

এদিকে ঘটনার পর মতিঝিল এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান নিয়েছেন। ব্যাংকের চলমান প্রশাসনিক পরিবর্তন ও গ্রাহকদের আন্দোলন ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে আর্থিক খাতে সুশাসন ও আস্থার প্রশ্নে।