বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৭ জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

যুদ্ধ বন্ধে মরিয়া ডোনাল্ড ট্রাম্প, বড় ছাড়ে নারাজ ইরান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়পক্ষই গত ৮ এপ্রিল শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতি ভেঙে আবারও সরাসরি যুদ্ধে ফিরে না যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। একদিকে ট্রাম্প চাইছেন দ্রুত যুদ্ধ থামিয়ে মার্কিন স্বার্থ আদায় করতে। অন্যদিকে ইরানও বড় ছাড় দেওয়া বা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতি স্বীকার করতে নারাজ।

তবে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় চলা শান্তি আলোচনা বাধাগ্রস্ত করতে পারে এমন সামরিক উসকানিও থেমে নেই। যুক্তরাষ্ট্র এখনও ইরানের নাগালে তাদের শক্তিশালী নৌ ও বিমানবাহিনী মোতায়েন করে রেখেছে। অন্যদিকে এটি নিশ্চিত যে, ইরানি শাসকরা তাদের বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রেখেছে এবং যুদ্ধবিরতির এই সময়টা তারা মার্কিন ও ইসরাইলি হামলায় হওয়া ক্ষয়ক্ষতি মেরামতে ব্যবহার করছে। বিবিসির এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

উপসাগরীয় এলাকায় এই সশস্ত্র উত্তেজনা দুপক্ষকেই ভুল হিসাব বা ভুল উপলব্ধির ঝুঁকিতে ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্র তেহরানকে চাপে রাখতে চায় এটি বুঝিয়ে যে, তারা কাছাকাছিই আছে এবং বড় ধরনের ক্ষতি করতে সক্ষম। বিপরীতে ইরান মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, তাদের প্রতিরোধের সংকল্পে কোনো চির ধরেনি। প্রয়োজনে তারা আবারও মার্কিনঘাঁটি এবং আরব উপসাগরীয় দেশগুলোর অবকাঠামোতে হামলা চালাবে।

একটি দীর্ঘস্থায়ী শান্তিচুক্তির প্রথম ধাপ হতে পারে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো এবং পরবর্তী আলোচনার এজেন্ডা নির্ধারণে একটি ‘সমঝোতা স্মারক’ স্বাক্ষর করা। কিন্তু বৈরুতে আবারও বোমা হামলার বিষয়ে ইসরাইলের ঘোষণা ডোনাল্ড ট্রাম্পের পথ আরও সংকীর্ণ করে দিয়েছে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই চুক্তিতে খুব একটা আগ্রহী নন। তার কাছে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো চুক্তি মানেই তা একটি ‘খারাপ চুক্তি’।

অন্যদিকে ইরান তাদের মিত্র হিজবুল্লাহকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, যেকোনো বড় চুক্তির শর্ত হিসেবে লেবাননে ইসরাইলি অভিযান বন্ধ করতে হবে। ট্রাম্প আপাতত ইসরাইলকে সংযত রাখার চেষ্টা করছেন বলে মনে হচ্ছে। হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিনিময়েও ইরান বড় কোনো মূল্য দাবি করবে। সেটি হতে পারে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা জব্দ করা সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া।

বর্তমানে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি জাহাজ চলাচল করছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরাইলি হামলার পর ইরান এই পথ বন্ধ করে দেয়। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বিকল্প পথে কিছু তেল পাঠাতে পারলেও বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ এখনও বন্ধ রয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক মহাবিপর্যয়।

ট্রাম্প এখন এক বড় ফাঁদে পড়েছেন। খুব সহজে জয়ী হওয়ার ভুল ধারণা নিয়ে তিনি যুদ্ধে জড়িয়েছিলেন। তিনি এবং তার মিত্র নেতানিয়াহু মারাত্মকভাবে অবমূল্যায়ন করেছিলেন যে, ইসলামি শাসনব্যবস্থা টিকে থাকার জন্য কতটা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। এই যুদ্ধ এখন যুক্তরাষ্ট্রেও দারুণ অজনপ্রিয়।

ট্রাম্পের মূল সমস্যা হলো, ইরান যেসব ছাড় দাবি করছে, তার নিজের রিপাবলিকান পার্টির কট্টরপন্থিরা তার ঘোর বিরোধী। আবার ট্রাম্প নিজেও চান না যে তার চুক্তিকে ২০১৫ সালে বারাক ওবামার করা পারমাণবিক চুক্তির সঙ্গে কেউ তুলনা করুক।

ইরানি শাসকরা মনে করেন, তারা তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করছেন। যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের হামলা তাদের এই অবস্থান থেকে টলাতে পারবে না। অন্যদিকে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোও চায় না এই যুদ্ধ আর চলুক। তাদের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ এই যুদ্ধের কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গিয়েছিলেন, তখন তারা দুজনেই বলেছিলেন যে তাদের বিমান শক্তিই তেহরানের শাসনব্যবস্থা ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য যথেষ্ট হবে। তারা ভুল ছিলেন। তারা প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে টিকে থাকা একটি শাসনব্যবস্থার লড়াই করার ক্ষমতা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন।

এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলসহ সারা বিশ্বকে সেই ভুলের পরিণাম ভোগ করতে হচ্ছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তির দরজা পুরোপুরি বন্ধ করেনি ইরান। তবে তেহরানের ভেতরে ক্ষমতার বিভিন্ন স্তরে অবস্থান এক নয়। সামরিক ও কট্টরপন্থি গোষ্ঠীগুলো কঠোর অবস্থান ধরে রাখলেও সরকারের কিছু অংশ বাস্তববাদী সমঝোতার পক্ষে ঝুঁকছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

আলজাজিরার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। যুদ্ধ শুরুর তিন মাস পেরিয়ে গেলেও হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল এবং ইরানি বন্দর অবরোধের প্রশ্নে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে এখনও ঐকমত্য হয়নি। একইভাবে পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছেলে মুজতবা খামেনি এখন ধর্মতান্ত্রিক ও সামরিক কাঠামোর শীর্ষে রয়েছেন। তিনি সরাসরি আলোচনার বিরোধিতা না করলেও বারবার বলেছেন, পারস্য উপসাগরের ভবিষ্যৎ ‘যুক্তরাষ্ট্রবিহীন’ হবে। পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে তিনি ‘জাতীয় সম্পদ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘস্থায়ী হবে ধরে নিয়ে ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’র প্রস্তুতি নিতে বলেছেন।

ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) শীর্ষ জেনারেলরা বড় ধরনের ছাড়ের বিপক্ষে। আইআরজিসিপ্রধান আহমদ ভাহিদি সতর্ক করেছেন, যুদ্ধ আবার শুরু হলে ‘ধ্বংসাত্মক জবাব’ দেওয়া হবে। সামরিক নেতৃত্ব হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে বলে দাবি করেছে।

সাবেক কমান্ডার মোহাম্মদ আলি জাফারি পাঁচটি শর্তের কথা বলেছেন সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ সম্পদ মুক্তি, ক্ষতিপূরণ এবং হরমুজে ইরানের সার্বভৌমত্ব স্বীকৃতি।

কট্টরপন্থি রাজনৈতিক শিবিরও রয়েছে প্রভাবকের ভূমিকায়। সাঈদ জালিলির নেতৃত্বাধীন ‘পায়দারি ফ্রন্ট’ আলোচনায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে। জালিলি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ভরসা করে কোনো দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি সম্ভব নয় এবং নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপ ‘নিরস্ত’ করতে হবে। সংসদের অনেক অতিরক্ষণশীল সদস্যও একই অবস্থানে রয়েছেন।

অন্যদিকে পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি যুদ্ধ বন্ধ ও জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষার লক্ষ্যে আলোচনা সমর্থন করেছেন। তারা ‘আত্মসমর্পণ নয়, তবে বাস্তববাদী সমঝোতা’ এই অবস্থান তুলে ধরছেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও আইআরজিসি-ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যমগুলোতে কঠোর অবস্থানই বেশি প্রতিফলিত হচ্ছে। হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ, জাহাজ চলাচলে ফি আরোপ এবং বিদেশে জব্দ থাকা অন্তত ১২ বিলিয়ন ডলার দ্রুত ফেরত পাওয়াকে সম্ভাব্য অন্তর্বর্তী চুক্তির শর্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

সর্বোপরি ইরানের ভেতরে ‘আত্মসমর্পণ নয়’- এমন ঐক্যবদ্ধ বার্তা থাকলেও আলোচনার ধরন ও ছাড়ের মাত্রা নিয়ে স্পষ্ট বিভাজন রয়েছে। যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রেখে সীমিত সমঝোতায় যাওয়া নাকি কঠোর অবস্থানে থাকা- এই দ্বিধার মধ্যেই এগোচ্ছে তেহরান।